আশির দশকের দাপুটে চিত্রনায়ক আব্দুল খালেক জসিম, যিনি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ‘অ্যাকশন কিং জসিম’ নামে পরিচিত। ভিলেন হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে অ্যাকশন হিরো হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। ক্যামেরার সামনে গুলি, বিস্ফোরণ কিংবা লড়াইয়ের দৃশ্যে নিজেই অভিনয় করতে পছন্দ করতেন জসিম। তার বিশ্বাস ছিল, একজন নায়ককে সাহসী ও দৃঢ়চেতা হতে হয়। শুধু পর্দায় নায়ক হিসেবেই নয়, নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তার হাত ধরেই ঢাকাই সিনেমায় সুযোগ পেয়েছিলেন একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক রিয়াজ।
জসিমের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন এই অভিনেতা। স্বাধীনতার পর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় তার। চলচ্চিত্রে প্রবেশ করে প্রথমদিকে খলনায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। তার তীব্র অভিব্যক্তি ও ভয়ংকর উপস্থিতি দর্শকদের মনে আলাদা ছাপ ফেলেছিল।
সত্তরের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে জসিমের পথচলা শুরু হয়। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেকের পর ১৯৭৩ সালে ‘রংবাজ’ সিনেমায় অ্যাকশন পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ভারতীয় জনপ্রিয় সিনেমা ‘শোলে’র আদলে নির্মিত ‘দোস্ত দুশমন’-এ জসিম গাফফার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। চরিত্রটিতে তার দুর্দান্ত অভিনয় দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শোলে’র গব্বর সিং চরিত্রের অভিনেতা আমজাদ খানও জসিমের অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন।
খলনায়ক হিসেবে সাফল্য পেলেও সেখানেই থেমে থাকেননি জসিম। ‘সবুজ সাথী’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর একের পর এক অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের প্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার সঙ্গে তার জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তার অভিনীত বিভিন্ন সিনেমায় শোষিত-বঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই ও সামাজিক বার্তা ফুটে উঠত, যা তাকে দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
জসিমের অভিনয় ও অ্যাকশন দৃশ্যের জনপ্রিয়তা আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকে আছে। ইউটিউব শর্টস ও ফেসবুক রিলসে এখনো তার অভিনয়, নাচ, মারপিট ও সংলাপের দৃশ্য ঘুরে বেড়ায়। তরুণদের অনেকেই তার সংলাপ অনুকরণ করেন, আবার তাকে ঘিরে তৈরি হয় নানা মিম ও ট্রল। পর্দায় তার স্বতন্ত্র উপস্থিতি ও অ্যাকশনধর্মী অভিনয় এখনো পুরোনো ও নতুন—দুই প্রজন্মের দর্শকের কাছেই আগ্রহের বিষয়।
অভিনয়ের বাইরে জসিমের অন্যতম বড় অবদান ছিল নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করা। তার সবচেয়ে আলোচিত আবিষ্কার নিঃসন্দেহে চিত্রনায়ক রিয়াজ। ১৯৯৪ সালে রিয়াজ তখনো চলচ্চিত্রের মানুষ নন। বিমানবাহিনীতে বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর চাকরি হারিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা ছিলেন তার চাচাতো বোন। একদিন ববিতার সঙ্গে বিএফডিসিতে গেলে সেখানেই জসিমের নজরে পড়েন সুদর্শন তরুণ রিয়াজ। তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে জসিম তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন।
অভিনয়ের অভিজ্ঞতা না থাকলেও জসিমের প্রস্তাব এবং ববিতার উৎসাহ রিয়াজকে চলচ্চিত্রে আসার সাহস জোগায়। পরের বছর, ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ মুক্তি পাওয়া ‘বাংলার নায়ক’ সিনেমায় জসিমের সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ পান রিয়াজ। সিনেমাটিতে জসিম ডন চরিত্রে, শাবানা রোকেয়া চরিত্রে এবং রিয়াজ মুন্না চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সিনেমার মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে রিয়াজের।
শুধু চলচ্চিত্রে সুযোগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি জসিম। নবাগত রিয়াজকে অভিনয় ও অ্যাকশনের বিভিন্ন কৌশলও হাতে-কলমে শেখাতেন তিনি। রিয়াজের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, এফডিসিতে জসিমের শুটিং চলার সময় তিনি নিয়মিত ফাইট প্র্যাকটিস করতেন। এমনকি নিজের শুটিং থাকলেও জসিম সময় বের করে তাকে অ্যাকশনের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পরবর্তীতে রিয়াজও একাধিকবার বলেছেন, জসিমের কারণেই তিনি ‘নায়ক রিয়াজ’ হয়ে উঠতে পেরেছেন।
‘বাংলার নায়ক’-এর পর রিয়াজ নিজের জায়গা তৈরি করতে খুব বেশি সময় নেননি। পরবর্তীতে ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’সহ একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। তবে তার দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রার প্রথম দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন জসিমই। ফলে রিয়াজকে আবিষ্কারের ঘটনাটি শুধু একজন নবাগতকে সুযোগ দেওয়ার গল্প নয়, এটি ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও হয়ে আছে।
জসিমের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে প্রায় দুই শতাধিক সিনেমা রয়েছে। এর মধ্যে ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’ ও ‘বুকের ধন’ উল্লেখযোগ্য। এসব সিনেমায় সামাজিক বার্তা, দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মতো নানা বিষয় উঠে এসেছে। ফলে জসিম শুধু পর্দার একজন অ্যাকশন তারকা নন, দর্শকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক।
বাস্তব জীবনেও জসিম ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তার সাহসিকতার গল্প পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে আছে। পর্দায় খলনায়ক কিংবা নায়কের চরিত্রে লড়াই করার সময় তার বাস্তব জীবনের সেই সাহস যেন অভিনয়েও প্রতিফলিত হতো। সিনেমার লড়াই, সংলাপ ও আবেগে তাই দর্শক অনেক সময় বাস্তবতার ছোঁয়া খুঁজে পেতেন। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তবে তার অভিনয়, অ্যাকশন এবং রিয়াজের মতো নতুন প্রতিভাকে সামনে নিয়ে আসার অবদান আজও ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।



