কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে। ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি, ক্লড ও কোপাইলটের মতো এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে তথ্য খোঁজা, পড়াশোনা, কাজের সহায়তা, পরামর্শ এমনকি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও আলোচনা করছেন অনেকে। রান্নার রেসিপি খোঁজা থেকে শুরু করে কোড লেখা, কাজের পরিকল্পনা তৈরি, সম্পর্ক নিয়ে পরামর্শ কিংবা মানসিক সহায়তা—বিভিন্ন প্রয়োজনে এআইয়ের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে।
২০২৫ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে থেরাপি ও মানসিক সহায়তার বিষয়টি উঠে আসে। ফলে কাজের সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও আবেগসংক্রান্ত নানা বিষয়েও এআইয়ের সঙ্গে কথা বলার প্রবণতা বাড়ছে। তবে এআইয়ের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রশ্ন। চ্যাটবট অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বা কাল্পনিক তথ্য দিতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করলে তৈরি হতে পারে গোপনীয়তার ঝুঁকি। চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও ভুল তথ্য বা পরামর্শ সমস্যার কারণ হতে পারে।
এ কারণে এআই চ্যাটবট ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মতো অস্পষ্ট ও বিতর্কিত বিষয়ে চ্যাটবটের দেওয়া তথ্য যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। চ্যাটবট কখনো ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্যকে সত্যের মতো উপস্থাপন করতে পারে, যাকে সাধারণভাবে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়। ফলে এ ধরনের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাসায়নিক, জৈবিক, রেডিওলজিক্যাল ও পারমাণবিক অস্ত্র বা হুমকির মতো সংবেদনশীল বিষয়েও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। এ ধরনের বিষয়ে এমন কোনো প্রশ্ন করা উচিত নয়, যা বিপজ্জনক পদার্থ বা অস্ত্র তৈরির ব্যবহারিক নির্দেশনা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়। একইভাবে গুরুতর অপরাধ বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড কীভাবে করা যায়—এ ধরনের তথ্যের জন্যও এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়।
কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সময় রোগী, গ্রাহক বা ক্লায়েন্টের গোপন তথ্য শেয়ার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ব্যবস্থা ও নীতিমালায় স্পষ্ট অনুমতি না থাকলে মেডিকেল রেকর্ড, ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, লগইন তথ্য, ব্যবসায়িক গোপন নথি কিংবা চুক্তির আওতাধীন তথ্য কোনো চ্যাটবটে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দিয়ে বা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত নিরাপদ ব্যবস্থা ব্যবহার করে কাজ করা উচিত।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে এআইয়ের ব্যবহারেও সতর্ক থাকা জরুরি। বিভিন্ন উপসর্গ লিখে সম্ভাব্য রোগ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রাথমিক তথ্য বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চ্যাটবটের উত্তরের ভিত্তিতে নিজে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা শুরু করা ঠিক নয়। এআই গুরুত্বপূর্ণ কোনো উপসর্গ বাদ দিতে পারে, ভুল সম্ভাবনা সামনে আনতে পারে কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য দিতে পারে। গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
মানসিক স্বাস্থ্য ও থেরাপির ক্ষেত্রেও এআইকে সহায়ক তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও এটি প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর বিকল্প নয়। বিশেষ করে গুরুতর মানসিক সংকট, আত্মহত্যার চিন্তা, সাইকোসিস বা অন্য কোনো জটিল মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে শুধু চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত অভিভাবক, পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে এআই চ্যাটবট তথ্য খোঁজা ও দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে কার্যকর সহায়ক হতে পারে, তবে এর উত্তর সব সময় নির্ভুল বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার না করা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা এবং চিকিৎসা, আইন বা মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



