মোবাইল ফোন, ওয়াই-ফাই কিংবা আধুনিক ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ক্যানসারের কারণ—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই অনেকের মধ্যে দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এই আশঙ্কার পেছনে বাস্তবভিত্তিক কোনো প্রমাণ নেই। মোবাইল ফোন ও ওয়াই-ফাই যে ধরনের বিকিরণ ব্যবহার করে, তা মানবদেহের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো শক্তিশালী নয় এবং তাই ক্যানসার সৃষ্টির ঝুঁকিও তৈরি করে না।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়ই মোবাইল ফোন কানের কাছে ধরে কথা বলি, আবার পকেট বা ব্যাগে রেখেও বহন করি। এ কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—ফোন থেকে নির্গত বিকিরণ কি মস্তিষ্ক, স্তন বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়? বাস্তবে মোবাইল ফোন বা মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত বিকিরণ হলো রেডিওফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন, যা খুবই দুর্বল ধরনের তরঙ্গ। এই বিকিরণ ডিএনএ ক্ষতি করতে পারে না, যা ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান শর্ত।
এ বিষয়ে পরিচালিত বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু গবেষণায় সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, সেগুলোর অনেকটাই প্রাণীর ওপর করা বা বাস্তব জীবনের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রার বিকিরণ ব্যবহার করে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সেসব গবেষণার ফলাফল মানুষের দৈনন্দিন মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। মানুষের ওপর পরিচালিত বড় আকারের গবেষণাগুলোতেও মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে ক্যানসারের কোনো ধারাবাহিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
৪জি বা ৫জি নেটওয়ার্ক নিয়েও অনেকের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও এসব প্রযুক্তি আগের তুলনায় উন্নত ও শক্তিশালী, তবুও এগুলোর বিকিরণ ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো শক্তিশালী নয়। মোবাইল টাওয়ার থেকে পাঠানো সিগন্যালও একই ধরনের রেডিওফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন ব্যবহার করে। প্রযুক্তি তুলনামূলক নতুন হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলমান থাকলেও, এখন পর্যন্ত ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একইভাবে ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, স্মার্ট ঘড়ি, ফিটনেস ট্র্যাকার বা ওয়্যারলেস হেডফোনের ক্ষেত্রেও ক্যানসার সৃষ্টির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এসব ডিভাইসও কম শক্তির রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার বদলে প্রমাণিত ঝুঁকির কারণগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, অতিরিক্ত মদ্যপান, সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিতে বেশি সময় থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব বিষয়ে সচেতন থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মোবাইল ফোন, ওয়াই-ফাই বা আধুনিক ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ক্যানসারের কারণ নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি যা এই দাবিকে সমর্থন করে। সঠিক তথ্য জানা, গুজব এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: Cancer Research UK



