জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আপত্তি সত্ত্বেও প্রায় ১ হাজার ৫০০ শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশটি এ প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এটি মিয়ানমারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার করা বৃহত্তর একটি প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। ওই পরিকল্পনার আওতায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা রয়েছে। মালয়েশিয়ার দাবি, পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছামূলক। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
রয়টার্সকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা যানসহ কয়েক ডজন বাস আসে। পরে বাসগুলো বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমারের দুটি নৌযান ও একটি হাসপাতাল জাহাজ নোঙর করা ছিল। তবে বাসগুলোতে কারা ছিলেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি গত ২৭ আগস্ট প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, মিয়ানমার সরকারের শনাক্ত করা ১ হাজার ৪৭৬ জন নাগরিককে এ প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের এক মুখপাত্র ও কুয়ালালামপুরে দেশটির দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি মাসে জানিয়েছে, যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে অস্থিরতা ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, মিয়ানমারের বর্তমান অবস্থা শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত নয়। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআর জড়িত ছিল না বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরণার্থীদের প্রতি স্থানীয়দের বিরূপ মনোভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চাপ বেড়েছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী রয়েছেন, যাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা।
চলতি বছর অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হয়রানি ও নজরদারি বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চলতি মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণের বিনিময়ে তিনি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানাবেন। এর আগে জুলাইয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার সর্বোচ্চ ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। এরপর থেকেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
তবে মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো রোহিঙ্গা রয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের চিন জনগোষ্ঠীর শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী জেমস বাওয়ি থাং বিক জানান, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। সম্প্রদায়ের নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি দাবি করেন, তাদের মধ্যে ইউএনএইচসিআরের কার্ডধারী একজনও রয়েছেন।
মিয়ানমার থেকে আগে ফেরত পাঠানো শরণার্থীদের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে জেমস আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এবার ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা দেশটিতে আটক বা জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের মুখে পড়তে পারেন। তার মতে, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাদের সামনের সারিতে লড়াই করতে বাধ্য করার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে এসব আশঙ্কা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র: রয়টার্স



