ভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের বার্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের Virginia অঙ্গরাজ্যে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। প্রবাসভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন Priyo Bangla–এর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বহুভাষিক সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া জোরদারের এক অনন্য উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল— “Languages Matter: Our Culture, Our Heritage, Our Future,” যা ভাষাকে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি Kenmore Middle School অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও কমিউনিটি নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বক্তারা বলেন, বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগ কেবল একটি জাতির ইতিহাস নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ, যার স্বীকৃতি হিসেবে UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল উচ্চপর্যায়ের আলোচনা পর্ব, যেখানে ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক সংহতিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। আলোচকরা বলেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা শিশুদের মানসিক বিকাশ ও আত্মপরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর বহুভাষিক যোগাযোগ সামাজিক সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান মার্কিন সিনেটর Mark Warner এবং ভার্জিনিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর Ghazala Hashmi। তারা ভাষাগত বৈচিত্র্যকে গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির অবদানকে প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম Voice of America–এর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি IEEE–এর ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট সাইফুর রহমান ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যকে মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামের সঙ্গে তুলনা করেন।
আলোচনা শেষে শুরু হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ইন্দোনেশীয় নৃত্য, লাতিন আমেরিকান সংগীত, গ্রিক সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা এবং বাংলা গান—বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় এক বৈশ্বিক মিলনমেলায়। বহুভাষিক এই আয়োজন স্পষ্ট করে তুলে ধরে—ভাষার ভিন্নতা বিভাজনের নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সংযোগ ও সহাবস্থানের সেতুবন্ধন।
আয়োজকরা জানান, এটি কেবল একটি দিবস উদযাপন নয়; ভাষাগত ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিজস্ব ভাষা ও পরিচয় তুলে ধরার একটি চলমান উদ্যোগ। কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতেও ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজ চালিয়ে যাবে। এই আয়োজন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল—মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাস, আত্মপরিচয়, অনুভূতি এবং মানবিক মর্যাদার গভীরতম প্রকাশ।



