আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই ইউরোপীয় সংসদ সদস্যরা (এমইপি) আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পৌঁছাবেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মূল নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ।
এবার ইইউ ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বড় পরিসরে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন করেছে। এই মিশনের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলটি নির্বাচনের আগ মুহূর্তের রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রচারণার পরিস্থিতি এবং ভোটগ্রহণের সার্বিক অবস্থা মূল্যায়ন করবে। প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় অবস্থানকালে প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশনার, পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় করবে বলে জানা গেছে।
গেল ২৪-এর প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইইউ বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক রূপান্তরকে সমর্থন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠিয়েছে। হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজা কালাসের সিদ্ধান্তে লাতভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ইভার্স ইজাবসকে মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের কোর টিমে রয়েছেন ১১ জন বিশ্লেষক, যারা ঢাকাভিত্তিক কাজ করছেন। এর পাশাপাশি গত ১৭ জানুয়ারি থেকে দেশের ৬৪ জেলায় মোতায়েন রয়েছেন ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যারা নির্বাচনী প্রস্তুতি, প্রচারণা, ভোটার তালিকা যাচাইসহ বিভিন্ন বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে এক সপ্তাহের জন্য আরও ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক আসবেন, যারা ভোটগ্রহণের দিন সরাসরি মাঠে উপস্থিত থাকবেন।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৭ সদস্যের প্রতিনিধি দল ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা এবং ফলাফল সংকলন প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে। তারা নির্বাচনী পরিবেশ, প্রচারণার স্বাধীনতা, ভোটার দমনের অভিযোগ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করবেন। নির্বাচন শেষে প্রাথমিক প্রতিবেদনে তারা অবদান রাখবেন এবং পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকাশিতব্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করবেন।
ইইউ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য দেখতে চায়। তাদের প্রত্যাশা, ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ থাকবে। নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সব সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাকেও তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। ইইউ এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও মানবাধিকার শক্তিশালী করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও এ বিষয়ে ইইউ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করে নীরব অবস্থান নিয়েছে। প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস জানিয়েছেন, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও জটিল রাজনৈতিক বিষয়, তবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি যদি নির্বাচনের অংশগ্রহণমূলকতা বা ভোটার উপস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে সেটি অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন আসায় এবারের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। এতে ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, রাজনৈতিক দলগুলো সংযত আচরণে উৎসাহিত হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী হবে বলে তারা আশাবাদী।



