দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিক সার হলো ইউরিয়া। তবে প্রচলিত ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ সার অপচয় হয়, যার ফলে কৃষক ও রাষ্ট্রকে বড় ধরনের আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
এই সমস্যার সমাধানে উৎপাদন বৃদ্ধি ও ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক প্রথমবারের মতো ন্যানো বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া সার উদ্ভাবনের দাবি করেছেন। গবেষকদের মতে, ন্যানো আকারের এই ইউরিয়া সার ব্যবহারে অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ইউরিয়া সারের অপচয় কমানো সম্ভব হবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করা যাবে।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) এই উদ্ভাবনের কথা জানান গবেষক দলের প্রধান, বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান। তিনি জানান, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) আর্থিক সহায়তায় ২০২৩ সাল থেকে এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গবেষক দলে আরও রয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ খোরশেদ আলম, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সিএসও ড. শেখ মনজুরা হক, বাকৃবির মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক, পিএইচডি ফেলো মো. আমজাদ হোসেন এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান রিপন।
ড. খায়রুল হাসান জানান, দুটি পদ্ধতিতে ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটার আকারের ন্যানো ইউরিয়া তৈরি করা হয়েছে, যা ন্যানো কার্বন দ্বারা কোটেড। এই কোটিংয়ের ফলে ইউরিয়া থেকে নাইট্রোজেন ধীরে ধীরে মুক্ত হয়, যা ধানসহ বিভিন্ন ফসলে নিয়ন্ত্রিতভাবে নাইট্রোজেন সরবরাহ নিশ্চিত করবে। এতে নাইট্রোজেনের অপচয় কমবে, ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষকরা কম সার ব্যবহার করেই বেশি লাভবান হবেন।
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা এখনো বাকি রয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে, আগামী বোরো মৌসুমের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে এই ন্যানো ইউরিয়ার পরীক্ষা শুরু করা যাবে। গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সার ব্যবহারে ইউরিয়ার প্রয়োজন কমপক্ষে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমবে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
গবেষণায় হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট-ইউরিয়া, ইউরিয়া-ন্যানো বায়োচার এবং হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট-ইউরিয়া-ন্যানো বায়োচার—এই তিন ধরনের ন্যানো হাইব্রিড উপাদান সফলভাবে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে। এফটিআইআর বিশ্লেষণে শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন নিশ্চিত হয়েছে এবং টিইএম বিশ্লেষণে কণার আকার ৩০–৩২ ন্যানোমিটারের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা গাছের কোষে সহজে প্রবেশ করতে সক্ষম।
গবেষকরা জানান, প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারে অ্যামোনিয়া গ্যাস নির্গমন, লিচিং, রানঅফ ও ডিনাইট্রিফিকেশনের কারণে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত নাইট্রোজেন অপচয় ঘটে। এর ফলে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
ন্যানো বায়োচার ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এতে অ্যামোনিয়া অপচয় ৮০–৯০ শতাংশ, নাইট্রেট লিচিং ৬৫–৭৫ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে। পাশাপাশি ধানের ফলন ১০–২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং প্রোটিনের মাত্রা ৮–১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে, যা ফসলের গুণগত মান ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে।
পিএইচডি ফেলো মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা তরল ন্যানো ইউরিয়া থাকলেও ন্যানো বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া সংশ্লেষণে তারাই প্রথম সফল হয়েছেন। মাঠপর্যায়ে সফল হলে এটি দেশের কৃষি খাতে একটি বড় মাইলফলক হবে।
কেজিএফের ক্লাইমেট অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্স বিভাগের সিনিয়র স্পেশালিস্ট ড. মো. মনোয়ার করিম খান বলেন, এই কোটেড ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম সার প্রয়োগ করেও ফলন অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হবে এবং পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
গবেষকদের মতে, বায়োচার কোটিংয়ের কারণে ইউরিয়া ধীরে মুক্ত হওয়ায় গাছ দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। ফলে জমির উর্বরতা বজায় থাকে, ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের ঝুঁকি কমে এবং পরিবেশের ওপর চাপ হ্রাস পায়।



