দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৪৯১ জন। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আত্মহননের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ জনে। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রস্তুত না হওয়ায় ওই মাসের তথ্য যুক্ত হয়নি। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫০৫ জন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৯২০ জন।
আত্মহত্যার পেছনের কারণ জানতে সম্প্রতি আত্মহনন করেছেন—এমন নারী-পুরুষের ১০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দৈনিক সমকাল। স্বজনরা জানান, পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংকট, আর্থিক ও সামাজিক চাপ, মানসিক জটিলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতাই এসব ঘটনার প্রধান কারণ। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগীদের কেউই মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা কমাতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত সোমবার গাজীপুরের পুবাইলে একটি রেলক্রসিংয়ে দুই সন্তানসহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ হাফেজা খাতুন মালা (৩৫)। এর আগে ১৬ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বড় মগবাজারে দাম্পত্য কলহের জেরে ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন শম্পা আক্তার রিভা (২৬)। ওই দুই দিনে রাজধানীতেই অন্তত ছয়জন আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগমুহূর্তে শম্পা তার স্বামীর মোবাইলে পাঠানো এক ভয়েস মেসেজে দাম্পত্য জীবনের মানসিক চাপ ও অপমানের অনুভূতির কথা তুলে ধরেন।
মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার কারণেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। গত শনিবার খিলগাঁওয়ে শাহানুর রহমান (৪৪) নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেন। তাঁর ভাই জানান, স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ, ব্যক্তিগত ঋণসহ নানা কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ভুগছিলেন। অন্যদিকে, সম্পর্কজনিত বিরোধের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়ছে। গত ১৭ জানুয়ারি মিরপুরে কলেজছাত্রী সানজিদা ইসলাম মিম (১৯) আত্মহত্যা করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গই তাকে এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা কখনোই একক কোনো কারণে ঘটে না। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা একাধিক মানসিক ও সামাজিক কারণ মিলেই আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। ব্যক্তিত্বের ধরনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে আত্মহত্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, কার্যকর জীবন কাঠামোর অভাব, সামাজিক অসহযোগিতা ও ন্যূনতম জীবনমানের অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করছে। সংকটের সময় মানুষ একা হয়ে পড়লে আত্মহননের প্রবণতা বাড়ে। এদিকে পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক বিরোধ ও মানসিক সংকটে দ্রুত হস্তক্ষেপ, কমিউনিটি পুলিশিং এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহায়তাও জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।



