স্মার্টফোন এখন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; খুব অল্প বয়সেই অনেক শিশু নিজের হাতে স্মার্টফোন পাচ্ছে। পড়াশোনা, যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের অজুহাতে পরিবারগুলো শিশুদের প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৩ বছর বয়সের আগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন দেওয়া তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সে স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শৈশব ও কৈশোরের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকালীন সময়ে গ্যাজেটের প্রভাব নিয়ে গবেষকরা এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণাপত্রটি চলতি মাসের শুরুতে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল American Academy of Pediatrics-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন র্যান বারজিলে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফিলাডেলফিয়া চিলড্রেনস হসপিটাল’-এর শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক।
এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি অঞ্চলের সাড়ে দশ হাজারেরও বেশি শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, যেসব শিশু ১২ বছর বয়সেই স্মার্টফোন পেয়েছে, তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি ৬০ শতাংশের বেশি এবং স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি ৪০ শতাংশের বেশি।
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ৩ হাজার ৪৮৬ জন কিশোর যারা ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন পায়নি, তাদের ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা গেছে, এই এক বছরের মধ্যে যারা স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করেছে, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং অপর্যাপ্ত ঘুমের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
গবেষকরা বলছেন, বয়ঃসন্ধির শুরুতে স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতা, স্থূলতা ও ঘুমের সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিমালা বা আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন তারা। র্যান বারজিলে বলেন, “বিষয়টি একদমই উপেক্ষা করার মতো নয়।”
এদিকে, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর কঠোর অবস্থান নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তারা ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ সব সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করেছে। দেশটি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, ১০ ডিসেম্বর থেকে শিশুদের সামাজিক মাধ্যমে প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে। মালয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ আগামী বছর থেকে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ শুরু হয়েছে। আরকানস, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, লুইসিয়ানা, মিসিসিপি, ওহাইও ও টেনেসিসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আইন পাস হয়েছে, যেখানে কম বয়সী কিশোরদের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট খুলতে মা-বাবার অনুমতি বাধ্যতামূলক।
শিকাগোর সাবেক ডেমোক্রেটিক মেয়র রাহম ইমানুয়েল শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টিকে ‘জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো অনুসরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের অংশীদারিত্ব বিক্রির জন্য একটি চুক্তি করেছে শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটক। চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওরাকল, সিলভার লেইক এবং আবুধাবিভিত্তিক কোম্পানি এমজিএক্স যৌথভাবে কোম্পানিটির ৪৫ শতাংশ মালিকানা পাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক ব্যবহারের সুযোগ বহাল থাকছে।


