গোটা বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তথাকথিত ‘এপস্টেইন ফাইল’। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত বিপুল নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। এসব নথির মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি ছবি এবং দুই হাজার ভিডিও। প্রকাশিত দলিলগুলোতে উঠে এসেছে ভয়াবহ যৌন অপরাধের বর্ণনা, যেখানে বিশ্বের প্রভাবশালী ধনকুবের, রাজনীতিক ও সেলিব্রিটিদের নাম জড়ানোর দাবি করা হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত অনেকেই এসব অভিযোগকে ‘বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
‘এপস্টেইন ফাইল’ বলতে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে তদন্ত ও বিচার সংক্রান্ত নথিপত্রকে বোঝানো হচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন শোষণ ও পাচারের একটি বিস্তৃত চক্র পরিচালনার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ১৮ বছরের কম বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের চেষ্টার দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। পরবর্তীতে যৌনপণ্য পাচারের মামলায় বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তার মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ একে আত্মহত্যা বলে জানালেও এ নিয়ে এখনো নানা রহস্য ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
গত ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব নথি প্রকাশ করে। এতে এপস্টেইনের কারাবাসকালীন বিস্তারিত তথ্য, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত রিপোর্ট, মৃত্যুর সময়কার পরিস্থিতি এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত নথিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, ম্যাক্সওয়েলকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে এপস্টেইনকে সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
প্রকাশিত ফাইলগুলোতে এপস্টেইনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির ই-মেইল ও যোগাযোগের তথ্যও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব যোগাযোগে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও বিকৃত আচরণের অভিযোগের উল্লেখ থাকায় বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
নথিতে যেসব নাম উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশ, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, ধনকুবের ইলন মাস্ক, যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নামও আলোচনায় এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম নথিতে শতাধিকবার উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হলেও তিনি বলেছেন, বহু বছর আগেই এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল এবং এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না।
নথিতে বিল গেটসকে ঘিরে আনা অভিযোগকে তার মুখপাত্র ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এদিকে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির সাবেক নেতা ও কূটনীতিক লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন নথিতে নাম আসার পর দলের সদস্যপদ ছাড়লেও তার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রসঙ্গে নথিতে থাকা একটি ই-মেইলে তার ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফর নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মন্তব্যকে ‘একজন দণ্ডিত অপরাধীর বিকৃত কল্পনা’ আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, মোদি ও এপস্টেইনের মধ্যে কোনো অর্থবহ যোগাযোগ বা পরামর্শমূলক সম্পর্কের প্রমাণ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন ফাইলের এই প্রকাশ শুধু একটি অপরাধী চক্রের পর্দা উন্মোচন নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব ও জবাবদিহির প্রশ্নে বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আরও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



