ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে পারিবারিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পড়াশোনা। এরপর সংসার ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ সময়। তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও স্বপ্ন কখনো হারিয়ে যায়নি। সেই স্বপ্ন পূরণে ৪৮ বছর বয়সে আবারও হাতে তুলে নেন বই-খাতা। অবশেষে ৫২ বছর বয়সে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জন করে উত্তীর্ণ হয়েছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার শেফালী বেগম। তাঁর এই অর্জনে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।
শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল মেধা ও সম্ভাবনায় ভরা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে মেধাতালিকায় স্থান পেলেও ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক নানা সংকটে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। একসময় বই-খাতা ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে। পরবর্তী সময়ে স্বামী-সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের শিক্ষার স্বপ্ন দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকে। তবে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কখনো হারাননি তিনি।
একপর্যায়ে স্বামী ও তিন সন্তানের উৎসাহে ৪৮ বছর বয়সে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, বয়সের ব্যবধান ও সংসারের ব্যস্ততা কোনো কিছুই তাঁর ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অর্জন করেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় তাঁর মূল জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ দাঁড়িয়েছে ৪.২১। তিনি গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
শেফালীর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। মায়ের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মায়ের এই সাফল্য আমাদের পরিবারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা আজ প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। আমি চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা অর্জন করুন।’
মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।”
গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, “দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছেই হার মানে। তাঁর সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।”
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলেন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে তাঁর মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
তাঁর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু বলেন, ‘শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।’
শেফালী বেগমের নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজও দাদির সাফল্যে আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছে। সে বলে, ‘আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি চিকিৎসক হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।’
শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে শেফালীর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বিশেষ করে সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক নানা কারণে যেসব নারী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের জন্য তাঁর সাফল্য নতুন করে পথচলার সাহস জোগাতে পারে। ৪৮ বছর বয়সে পড়াশোনা শুরু করে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাসের মাধ্যমে শেফালী বেগম দেখিয়েছেন, স্বপ্ন পূরণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব।



