ভ্যাপসা গরমে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু অস্বস্তি নয়, বরং শরীর যেন একেবারেই গরম সহ্য করতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় হিট ইনটলারেন্স। অর্থাৎ, গরম পরিবেশে শরীর নিজের তাপমাত্রা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কখনও সাধারণ সমস্যা হলেও অনেক ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরের গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
হিট ইনটলারেন্সের লক্ষণ কী কী?
গরমে শরীর খারাপ লাগা অনেকেরই হয়, তবে নিচের উপসর্গগুলো নিয়মিত হলে সতর্ক হওয়া উচিত— অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া, মাথাব্যথা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা, মনোযোগ কমে যাওয়া, মুড পরিবর্তন (খিটখিটে ভাব), বমি বমি ভাব এবং দ্রুত শ্বাস নেওয়া। এই লক্ষণগুলোর অনেকগুলো অন্য রোগেও দেখা যেতে পারে, তাই নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কেন হয় হিট ইনটলারেন্স?
মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় ৯৮.৬° ফারেনহাইট। এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম। যখন এই সিস্টেমে সমস্যা হয় (যাকে ডিসঅটোনোমিয়া বলে), তখনই দেখা দেয় হিট ইনটলারেন্স। এর পেছনে যেসব কারণ থাকতে পারে— ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, অ্যালকোহল ব্যবহারের সমস্যা, ডায়াবেটিস, গিলেন-বারে সিনড্রোম (স্নায়ুর রোগ), হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা) এবং পারকিনসনস ডিজিজ।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু মানুষ গরমে বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকেন— শিশু ও বয়স্করা, যারা আগে হিট স্ট্রোক বা হিট এক্সহস্টশনে ভুগেছেন, শারীরিকভাবে কম ফিট ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, মেনোপজে থাকা নারী, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ গ্রহণকারী (যেমন: এন্টিডিপ্রেসেন্ট, প্রেসার বা পারকিনসনের ওষুধ) এবং দীর্ঘ সময় রোদে থাকা বা গরম এলাকায় কাজ করা ব্যক্তিরা।
কীভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা করা হয়?
চিকিৎসক সাধারণত রোগীর ইতিহাস নেন, শারীরিক পরীক্ষা করেন এবং রক্ত পরীক্ষাসহ প্রয়োজনে ইমেজিং টেস্টও নেন। এসবের মাধ্যমে মূল কারণ খুঁজে বের করা হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো উপসর্গ কমানো এবং গরম সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ানো। যদি ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের মতো রোগ থাকে, সেটার চিকিৎসাই মূল সমাধান। প্রয়োজনে ওষুধ পরিবর্তন বা ডোজ কমানো হতে পারে।
জীবনযাপনে কী পরিবর্তন আনবেন?
কিছু সহজ অভ্যাসই আপনাকে অনেকটা সুরক্ষিত রাখতে পারে— প্রচুর পানি পান করুন, ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন, বেশি গরম বা আর্দ্রতায় বাইরে কম বের হন, ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের কাপড় পরুন, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন, ফ্যান বা এসি ব্যবহার করুন এবং ঠান্ডা কাপড় বা নেক র্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
কীভাবে প্রতিরোধ ও অবহেলার জটিলতা
গরমে সমস্যা বাড়ার আগেই সতর্কতা জরুরি— বাইরে থাকার সময় কমান, প্রয়োজনে কুলিং সেন্টার ব্যবহার করুন এবং শরীরকে সবসময় ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন। হিট ইনটলারেন্স অবহেলা করলে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে— হিট ক্র্যাম্পস (অতিরিক্ত ঘামে পেশিতে টান), হিট এক্সহস্টশন (দুর্বলতা, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস), হিট র্যাশ (ত্বকে ফুসকুড়ি) এবং সবচেয়ে মারাত্মক হিট স্ট্রোক—যাতে খিঁচুনি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
গরম সহ্য না হওয়াটা অনেক সময় সাময়িক সমস্যা হলেও, যদি বারবার হয় বা উপসর্গগুলো তীব্র হয়, তাহলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ এটি শরীরের ভেতরের কোনো জটিল রোগের সংকেতও হতে পারে। তাই নিজেকে সচেতন রাখুন, গরমে সাবধানে থাকুন, আর প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
সূত্র: হেলথ



