বাংলাদেশের খাল, বিল ও ঝিলে বহু প্রকার জলজ উদ্ভিদ দেখা গেলেও এখন এসব প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার মুখে। সঠিক পরিচর্যার অভাব ও পরিবেশগত বৈরিতায় বিলুপ্তির পথে অনেক মূল্যবান উদ্ভিদ। এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রামীণ জনপদের পরিচিত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর জলজ ফল—মাখনা।
একসময় টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের কালিয়ান বিলসহ নানা অঞ্চলে মাখনার প্রাচুর্য ছিল। বাহারি রঙ, কাঁটাযুক্ত পাতা ও ফল এবং ফুলের সৌন্দর্য এ উদ্ভিদকে করে তোলে মনোমুগ্ধকর। তবে এর পাতা ও ফলের গোড়ায় থাকা সূচালো কাঁটায় অসতর্ক হলে রক্তপাতের আশঙ্কাও থাকে। মাখনার আরেক নাম ফক্সনাট। এটি মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্ভিদ। লাল শাপলার মতো দেখতে এই উদ্ভিদের পাতা হয় আরও বড়, যা মিঠা পানির জলাভূমিতে জন্মায়।
প্রতিবছর এপ্রিল-মে মাসে মাখনা গাছে ফুল ও ফল ধরে। ফলের ভেতর থাকে অসংখ্য সাদা নরম বীজ, যা কাঁচা খাওয়া যায়। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রোটিন, শর্করা, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের অন্যতম উৎস। এটি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এবং ডায়রিয়া ও বাত রোগেও উপকারী। মাখনার শুকনো বীজ থেকে তৈরি করা যায় মোয়া, মুড়কি ও খই জাতীয় সুস্বাদু খাদ্য, এমনকি রুটিও।
মাখনার বড় বাজার রয়েছে পুরান ঢাকার ইসলামপুর, বড়কাটরা ও ছোটখাটরায়। কিন্তু বর্তমানে কালিয়ান বিলে দেখা যাচ্ছে, চারদিকে বিল জবরদখল করে কেউ কেউ মাটি কেটে কৃষিজমিতে রূপান্তর করছেন। ফলে সংকুচিত হয়ে আসা বিলে মাখনা জন্মানোর জায়গা সঙ্কুচিত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে ফলনের পরিমাণ। পাশাপাশি বন উজাড় এবং বনায়নের নামে হালচাষ করায় টিলার মাটি বিলে ধুয়ে পড়ছে, যা মাখনার বিস্তার বাধাগ্রস্ত করছে।
এই বিলে গিয়ে দেখা গেছে, এখনও কিছু জায়গায় হালকা পানিতে বাতাসে দুলছে রঙিন মাখনার পাতা, আর তার চারদিকে পানকৌড়ি, ডাহুক, কালেম, বক, শামুকখোলসহ নানা পাখির উপস্থিতি এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় চাম্বলতলা গ্রামের ৭৫ বছরের হোসেন আলী জানান, তিনি ছোটবেলায় এই বিলে মাখনা তুলতেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষ এই ফল খেয়ে বেঁচে ছিলেন। মাখনা আজও গরিবের পুষ্টিকর ফল হিসেবে পরিচিত। গান্ধী গ্রামের মনোয়ারা বেগম জানান, আগে এই বিলে প্রচুর মাখনা পাওয়া যেত, যা পিষে রুটি বানিয়ে খেতেন। এবারের কম বৃষ্টির কারণে ফলনও কম।
কালিয়ান গ্রামের মোকছেদ আলী জানান, তিনি ৩০ বছর ধরে মাখনা তুলে ঢাকায় বিক্রি করছেন। কিন্তু এবার ফলন কম। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন বন উজাড়, টিলার মাটি ধুয়ে বিল ভরাট এবং প্রভাবশালীদের জবরদখল। তিনি বলেন, “এইভাবে চললে মাখনা সহ সকল জলজ প্রাণ ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”
এই বিপর্যয় রোধে ও দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার এবং পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।



