দীর্ঘ তিন দশকের প্রাকৃতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা ও সামাজিক আন্দোলনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভাসানচরের মালিকানা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলো। ভূমি মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, ভাসানচরের ছয়টি মৌজা চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্য দিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সীমানা বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি টানল সরকার।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন অনুমোদন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরেজমিন তদন্ত, ঐতিহাসিক দলিল পর্যালোচনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ভাসানচর সন্দ্বীপ উপজেলার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
ভাসানচরের সীমানা নির্ধারণে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে গঠিত কারিগরি কমিটি একাধিক ধাপে কাজ করে। এই কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, দুই জেলার জেলা প্রশাসক, সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উভয় উপজেলা থেকে তিনজন করে পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত হয়—ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিএস ও আরএস জরিপ নথি, দিয়ারা জরিপ, বন বিভাগের তথ্য এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাসানচরের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা হবে। এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা যে প্রতিবেদন দেয়, সেখানে দ্বীপটির ছয়টি মৌজাকেই সন্দ্বীপ উপজেলার অংশ হিসেবে দেখানো হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয় সেই প্রতিবেদন অনুমোদনের মাধ্যমে চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করে, যা প্রশাসনিকভাবে ভাসানচরের অবস্থান নির্ধারণে সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা রাখে।
ভাসানচরের ইতিহাস মূলত সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের দিকে ভয়াবহ নদীভাঙনে ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়ে যায়। হাজারো মানুষ তখন ভিটেমাটি হারিয়ে সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ভাঙা স্থানের কাছাকাছি নতুন করে চর জেগে উঠতে শুরু করে। সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থান করা এই নতুন ভূমি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। বন বিভাগের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই ভূমির অস্তিত্ব স্পষ্ট হতে থাকে।
দীর্ঘদিন স্থানীয়ভাবে এই চর ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণের পর দ্বীপটির নাম পরিবর্তন করে ‘ভাসানচর’ রাখা হয়। নামকরণের পর থেকেই এটি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
তবে একই বছরে দিয়ারা জরিপের ভিত্তিতে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবে দেখিয়ে সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করলে সন্দ্বীপবাসীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাদের দাবি ছিল, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে ভাসানচর সন্দ্বীপেরই অংশ, অথচ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেটিকে নোয়াখালীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ভাসানচর থানা গঠনের প্রজ্ঞাপনেও দ্বীপটিকে হাতিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত দেখানো হলে সন্দ্বীপে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র, পেশাজীবী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানান।
এই প্রেক্ষাপটে সন্দ্বীপের বাসিন্দা মনিরুল হুদা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। আদালত নির্বাহী বিভাগকে সীমানা জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দিলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বর্তমান সিদ্ধান্ত আসে।
আজও সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ তাদের হারানো বসতভিটার অবস্থান দেখাতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দা ডিপটি সওদাগর জানান, তার বাড়ি ছিল ন্যায়ামস্তির ৩ নম্বর ওয়ার্ডে, যা বর্তমানে ভাসানচরের মধ্যভাগে পড়েছে। তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে ভাঙনের কারণে তাদের এলাকা ছাড়তে হয়। ভাসানচরকে নোয়াখালীর সঙ্গে যুক্ত করার কোনো যৌক্তিকতা তারা কখনোই খুঁজে পাননি।
সীমানা বিরোধ নিরসনের পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই দুই জেলার মানুষের মধ্যে নানা কর্মসূচি ও পাল্টাপাল্টি দাবির ঘটনা ঘটে। গত ৭ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসানচরকে হাতিয়ার অংশ দাবি করে একটি পোস্ট নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। একই সময়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও চট্টগ্রামে মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে হাতিয়াবাসীর পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ জানানো হয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে চর জাগা ও ভাঙন একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী, কোনো ইউনিয়ন বা মৌজা ভেঙে গিয়ে পরে একই স্থানে নতুন ভূমি জাগলে সেটিকে সাধারণত পূর্ববর্তী এলাকার উত্তরাধিকার হিসেবেই গণ্য করা হয়। ভাসানচরের ক্ষেত্রেও সেই নীতির প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা বলেন, ভাসানচর নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। প্রশাসনিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন মানুষ স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করছে। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে পরবর্তী নির্দেশনা পেলে বাকি কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।



