ব্যস্ত শহুরে জীবনে সকালের রোদ দেখা আজ অনেকের কাছেই যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুম ভাঙতেই মোবাইল ফোনে চোখ, তাড়াহুড়ো করে তৈরি হওয়া, অনেক সময় নাস্তা বাদ দিয়েই বেরিয়ে পড়া—এই চক্রে দিনের শুরুটাই হয় ঘরের ভেতর। বাইরে বেরোলেও তখন সূর্য মাথার ওপর, চোখে সানগ্লাস, গায়ে সানস্ক্রিন। ফলে শৈশবে খেলার মাঠে যে নরম সকালের রোদ গায়ে মেখে বড় হওয়া, সেই অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিক জীবনে।
ডিজিটাল জীবনযাপন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট আর শহুরে ব্যস্ততায় মানুষ ক্রমেই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একসময় সূর্যের আলোতেই দিনের সূচনা হতো, অথচ এখন অনেকের সপ্তাহ কেটে যায় সূর্যের মুখ না দেখেই। বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, রোদ মানেই ত্বক পুড়ে যাওয়া বা কালচে হয়ে যাওয়া। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোরের নরম সূর্যের আলো শরীর ও মনের জন্য এক অসাধারণ উপহার, যার উপকারিতা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি।
চিকিৎসকেরা বলছেন, নিয়মিত সকালের রোদ না পাওয়ার অভ্যাস শরীর ও মনের জন্য মোটেও ভালো নয়। আর্টেমিস হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. পি. ভেঙ্কটা কৃষ্ণনের মতে, সকালের সূর্যের আলো প্রকৃতির দেওয়া এক নীরব ওষুধের মতো। প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট সকালের রোদে থাকলেই শরীর ও মনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অফ ইন্ডিয়া-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সকালের রোদ আমাদের শরীরের জৈব ঘড়ি বা সময়চক্র ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সূর্যের আলো চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় যে দিন শুরু হয়েছে। তখন শরীরে তৈরি হয় সেরোটোনিন নামের হরমোন, যা মন ভালো রাখে, কাজে মনোযোগ বাড়ায় এবং উদ্বেগ ও হতাশা কমাতে সাহায্য করে। এ কারণেই সূর্যের আলোকে অনেক সময় প্রাকৃতিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বলা হয়।
এই সেরোটোনিনই দিন শেষে রূপ নেয় মেলাটোনিনে, যা গভীর ও আরামদায়ক ঘুম নিশ্চিত করে। ফলে দিনের বেলা পর্যাপ্ত রোদ না পেলে রাতে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকলে অনেকের মধ্যেই মৌসুমি বিষণ্নতা, ক্লান্তি ও আগ্রহহীনতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
সকালের সূর্যের আলো হৃদ্যন্ত্রের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যের আলো ভিটামিন ডি-এর প্রধান উৎস, যা শুধু হাড় নয়, হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। ভিটামিন ডি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, ধমনিকে নমনীয় করে এবং রক্ত সঞ্চালন সহজ করে, ফলে হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ কমে। পাশাপাশি সূর্যের আলো শরীরের কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন কমাতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে সূর্যের আলো সবচেয়ে উপকারী। এ সময় রোদের তেজ কম থাকে, কিন্তু ভিটামিন ডি তৈরির জন্য যথেষ্ট কার্যকর। প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট খোলা জায়গায় বসে থাকা বা হালকা হাঁটাহাঁটিই যথেষ্ট। ব্যস্ত জীবনে আলাদা সময় বের করা কঠিন মনে হলেও একটু আগে ঘুম থেকে উঠে বারান্দা, ছাদ কিংবা বাড়ির আশপাশে কিছুক্ষণ হাঁটলেই এই উপকার পাওয়া সম্ভব। ছোট এই অভ্যাসই বদলে দিতে পারে শরীর, মন আর সুস্থ জীবনের গল্প।



