নাগাল্যান্ডের পাহাড়ঘেরা শান্ত গ্রাম খোনোমা—যেখানে নেই শহরের কোলাহল, নেই আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রের ঝলমলে আয়োজন। তবুও এই গ্রামটি আলাদা করে নজর কাড়ে মানুষের জীবনযাপন, আচরণ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের কারণে। কারণ এখানে এমন দোকান রয়েছে, যেখানে কোনো দোকানদার নেই—তবুও দিনের পর দিন সেগুলো সুশৃঙ্খলভাবে চলছে।
খোনোমা কোনো প্রচলিত পর্যটন স্পট নয়। এখানে নাইটলাইফ বা ভিড়ের আকর্ষণ নেই। তবে যারা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকতে চান এবং দায়িত্বশীল ও নৈতিক সমাজব্যবস্থার বাস্তব উদাহরণ দেখতে চান, তাদের জন্য খোনোমা এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে। সবুজে ঘেরা, পরিচ্ছন্ন ও নিরিবিলি এই গ্রামটি দেখিয়ে দেয়—পারস্পরিক বিশ্বাস আর সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকলে একটি সমাজ কত সুন্দরভাবে চলতে পারে।
এই গ্রামে চুরি বা অসততা নিয়ে সতর্কবার্তা চোখে পড়ে না। কারণ গ্রামবাসীর মধ্যে অসততার ভয় প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক সময় বাড়ির দরজাও তালাবিহীন থাকে। এখানে বিশ্বাস শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা প্রতিদিনের জীবনে বাস্তবে চর্চা করা হয়।
শহরের উন্নত জীবনের খোঁজে মানুষ ছুটে গেলেও সেখানে দূষিত বাতাস, যানজট আর পানিদূষণ নিত্যসঙ্গী। খোনোমা ঠিক তার উল্টো—শান্ত, পরিচ্ছন্ন এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৯৮ সালে খোনোমা নেচার কনজারভেশন অ্যান্ড ট্র্যাগোপান স্যাংচুয়ারি প্রতিষ্ঠার পর গ্রামটিকে ভারতের প্রথম “সবুজ গ্রাম” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই গ্রামে মূলত আংগামি নাগা জনগোষ্ঠীর বসবাস। একসময় শিকার ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে ১৯৯৮ সালে শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার পর গ্রামবাসীর জীবনধারায় বড় পরিবর্তন আসে। শিকার বন্ধ করে তারা বন সংরক্ষণ, কৃষিকাজ ও পশুপালনের দিকে মনোযোগ দেয়, যা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি টেকসই জীবিকার পথও তৈরি করে।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, খোনোমার জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন এবং পরিবারগুলো বসবাস করে ৪২৪টি ঘরে। জনসংখ্যা কম হলেও সামাজিক শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের দিক থেকে এই গ্রাম বহু বড় শহরের জন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
খোনোমার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এখানকার দোকান ব্যবস্থা। এখানে অনেক দোকানেই কোনো দোকানদার নেই। দোকানে পণ্য সাজানো থাকে, প্রতিটি জিনিসের গায়ে দাম লেখা। ক্রেতা নিজে প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য নেয় এবং নির্ধারিত টাকা রেখে যায়। কাউকে পাহারা দিতে হয় না, নজরদারিও নেই—সবকিছু চলে বিশ্বাসের ওপর।
শুধু দোকানই নয়, গ্রামে একটি কমিউনিটি লাইব্রেরিও রয়েছে। এখান থেকে যে কেউ বই নিয়ে পড়তে পারে এবং পরে তা ফেরত দেয়। চাইলে নিজের বইও সেখানে রেখে যেতে পারে। এই ব্যবস্থাগুলো গ্রামবাসীর পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ছোট গ্রাম হলেও খোনোমায় দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। পাহাড়ি প্রকৃতি, সবুজ বন আর নিরিবিলি পরিবেশে হাঁটা কিংবা ট্রেকিং করা যায়। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য রয়েছে খোনোমা ফোর্ট—যেখানে উনিশ শতকে আংগামি নাগারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
খোনোমা শুধু একটি গ্রাম নয়, বরং একটি চিন্তার নাম। বিশ্বাস, সততা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ যে একটি সমাজকে কত সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে পারে—খোনোমা তার জীবন্ত উদাহরণ। আধুনিক জীবনে যখন মানবিক মূল্যবোধ ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই গ্রাম আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—উন্নয়ন মানেই কেবল কংক্রিটের শহর নয়।
সূত্র: NDTV



