একজন খেলোয়াড় তার দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারেন—এর উত্তর খুঁজতে খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। পেলে-ম্যারাডোনা, ব্র্যাডম্যান-শচীন, বোল্ট-ফেলপস কিংবা আধুনিক যুগের মেসি-রোনালদোদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই একজন খেলোয়াড় তার দেশকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরতে পারেন। ঠিক সেই বাস্তবতারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমান।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বিশ্ব ক্রিকেট যখন উত্তেজনায় ফুটে ওঠার কথা, তখন পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। এবারের আসর ঘিরে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) নিজেই দিশেহারা। এর মূল সূত্রপাত মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক নজিরবিহীন সংকট থেকে। এক খেলোয়াড়ের ইস্যু যে পুরো বিশ্বকাপ, এমনকি বৈশ্বিক ক্রিকেট অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিতে পারে—‘মোস্তাফিজ ইস্যু’ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স এবারের নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজকে দলে নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপের মুখে তাকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়। এতে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন মোস্তাফিজ। তবে এই ঘটনা কেবল একজন খেলোয়াড়ের দলছুট হওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি রূপ নেয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটীয় ও কূটনৈতিক সংকটে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলাদেশ সরকার আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের এই অবস্থানে সংহতি জানায় পাকিস্তানও। প্রাথমিকভাবে পুরো টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকি দিলেও পরে তারা জানায়, অংশ নিলেও ভারতের বিপক্ষে বহুল আলোচিত ম্যাচটি তারা খেলবে না। ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আকর্ষণ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বাতিল হওয়ার আশঙ্কায় আইসিসির সামনে ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপ মিলিয়ে এই ম্যাচ বাতিল হওয়া মানেই আইসিসির রাজস্ব মডেলে বড় ধস। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে শুধু বিজ্ঞাপন থেকেই আয় হয় প্রায় ৩০০ কোটি রুপি। ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ব্রডকাস্টার জিওস্টার আইসিসির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
এই সংকট সামাল দিতে আইসিসি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। চেয়ারম্যান জয় শাহর ডেপুটি ইমরান খাজাকে বিশেষ দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকার ও বোর্ড তাদের অবস্থানে অনড়। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, খেলায় রাজনীতির বিরোধিতা করতেই তারা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—যাকে ঘিরে এত আলোড়ন, সেই মোস্তাফিজুর রহমান সম্পূর্ণ নীরব। কোনো মন্তব্য নয়, কোনো প্রতিক্রিয়া নয়। পরিবার, অনুশীলন আর ম্যাচ—এই তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন তিনি। মাঠের বাইরের ঝড় তাকে স্পর্শ করেনি।
আইপিএল থেকে বাদ পড়ার পরপরই পিএসএলের দল লাহোর কালান্দার্স সরাসরি চুক্তিতে সাড়ে ৬ কোটি রুপিতে তাকে দলে নেয়। সেখানেও কোনো উচ্ছ্বাস বা বক্তব্য নয়—শুধু প্রস্তুতি। এই মানসিক দৃঢ়তাই তাকে আলাদা করে তুলেছে। কোচ সালাউদ্দীন পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, চাপ সামলানোর এই ক্ষমতা মোস্তাফিজের কাছ থেকেই শেখার মতো।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাটেই অভিষেকে নজরকাড়া সাফল্য, আইপিএল-পি এস এল-বিপিএল-কাউন্টি ক্রিকেট—যেখানেই খেলেছেন, সেখানেই নিজের ছাপ রেখেছেন ‘দ্য ফিজ’। কাটারের মায়াজালে ব্যাটসম্যানদের বেঁধে ফেলাই যেন তার স্বাভাবিক দক্ষতা।
সবকিছু মিলিয়ে আজ সাতক্ষীরার সেই বিস্ময় বালক শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেরই এক অনন্য চরিত্র। মাঠে পারফরম্যান্স, মাঠের বাইরে নীরব দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান এখন সত্যিকার অর্থেই বিশ্ব ক্রিকেটের ‘ওয়ান পিস’।



