লিভার আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা হজম, পুষ্টি শোষণ এবং বিষাক্ত পদার্থ অপসারণের কাজ করে। কিন্তু যদি লিভারের ওজনের ৫ শতাংশের বেশি চর্বি জমে, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। যখন এই চর্বি জমে মদ্যপান ছাড়াই লিভারে ক্ষতি করে, তখন তাকে বলা হয় মেটাবলিক অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (MAFLD)। এটি এক নীরব ঘাতক, কারণ প্রাথমিকভাবে এর তেমন লক্ষণ থাকে না, অথচ দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে ফ্যাটি লিভার থেকে লিভারের প্রদাহ (ন্যাশ), সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর কিংবা লিভার ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এটি হৃদরোগ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এই রোগ আরও উদ্বেগের কারণ, কারণ তাদের ক্ষেত্রে সুগার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
এই রোগের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ: ওবেসিটি বা অতিরিক্ত ওজন, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি থাকা (বিশেষ করে ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরল), উচ্চ রক্তচাপ, এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যেমন অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ। এর সঙ্গে যোগ হয় অনিয়মিত বা অনুপস্থিত ব্যায়াম।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বেশি। কারণ এদের দেহে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেশি থাকে, রক্তে শর্করা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ থাকে এবং রক্তে চর্বির মাত্রাও বেশি দেখা যায়।
এই রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত লক্ষণহীন থাকে, এজন্য একে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। তবে রোগের তীব্রতা বাড়লে ক্লান্তি, পেটের ওপরের ডান পাশে অস্বস্তি বা ব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, বমি ভাব, জন্ডিস, পেটে পানি জমা ও পা ফোলা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
সৌভাগ্যের বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভার যদি সিরোসিস বা জটিল স্তরে না পৌঁছে, তবে এটি সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ওবেসিটি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হরমোন বিশেষজ্ঞ বা লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিরোধে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনধারা। নিয়মিত ফল, সবজি, শস্য ও চর্বিহীন প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনি পরিহার করা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপ (যেমন হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং বা সাঁতার), পর্যাপ্ত পানি পান ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা—এই অভ্যাসগুলো ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরল থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ এবং জীবনযাপন ঠিক রাখা দরকার।
তবে একবার চিকিৎসা নিলেই শেষ নয়। পুনরায় অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বা অলস জীবনযাপনে ফিরে গেলে, আবারও ফ্যাটি লিভার ফিরে আসতে পারে। তাই এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়মিত সচেতনতা ও জীবনশৈলীর নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।


