সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাতা ও সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মাসিক ভাতার হার ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৩২তম সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সভায় জানানো হয়, ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে বর্ধিত ভাতা কার্যকর হবে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য নতুন করে মাসিক সম্মানি ভাতা চালুর সুপারিশও করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এই সিদ্ধান্ত সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা, প্রতিবন্ধী, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, মা ও শিশু, জেলে এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীদের ভাতা ও সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ বাড়িয়ে ৬২ লাখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার বয়স্ক ব্যক্তি মাসিক ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন। পাশাপাশি ৯০ বছর ঊর্ধ্ব ২ লাখ ৫ হাজার বয়স্ক ব্যক্তি মাসিক ১ হাজার টাকা হারে ভাতা পাবেন।
একই মন্ত্রণালয়ের বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা কার্যক্রমে মোট ২৯ লাখ উপকারভোগীর মধ্যে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার জন মাসিক ৭০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। এছাড়া ৯০ বছর ঊর্ধ্ব ২৫ হাজার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মাসিক ১ হাজার টাকা হারে ভাতা পাবেন।
প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রমে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৬ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ জন মাসিক ৯০০ টাকা এবং ১৮ হাজার ১০০ জন মাসিক ১ হাজার টাকা হারে ভাতা পাবেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির পরিমাণ বাড়িয়ে প্রাথমিকে ৯৫০ টাকা, মাধ্যমিকে ১ হাজার টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১ হাজার ১০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ৭ হাজার বাড়িয়ে ২ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৯ জনে উন্নীত করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও মেধাবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ৩৩৮ জনে উন্নীত করা হয়েছে এবং ৫ হাজার ৪৯০ জনকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গুরুতর রোগে আক্রান্তদের সহায়তা কার্যক্রমেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিস, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তার উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এককালীন চিকিৎসা সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় একজন মা মাসিক ৮৫০ টাকা করে ভাতা পাবেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ বাড়িয়ে ৬০ লাখ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবার মাসে ৩০ কেজি চাল ১৫ টাকা কেজি দরে ছয় মাস ধরে পাবে।
এছাড়া সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভিজিএফ কর্মসূচিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে নতুন করে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন জেলেকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১৫ লাখ জেলেকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় আনার প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা আরও জোরদার করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



