বার্ধক্যকে থামিয়ে দিয়ে দীর্ঘায়ু অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করছে রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উদ্যোগে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসা প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের বার্ধক্য ধীর করা এবং আয়ু বৃদ্ধি করা। রুশ সরকার ইতোমধ্যে জিন থেরাপি, বায়োপ্রিন্টিং, অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের মতো প্রযুক্তি নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা শুরু করেছে। এমনকি জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত মিনি-পিগের মাধ্যমে মানুষের উপযোগী অঙ্গ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
সম্প্রতি বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথোপকথনে পুতিন বলেছিলেন, ভবিষ্যতে মানুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এক ধরনের অমরত্ব অর্জন করতে পারবে। অনেকেই বিষয়টিকে সাধারণ মন্তব্য হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি “লংজেভিটি” বা দীর্ঘায়ু কর্মসূচির প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা জেফ বেজোস, স্যাম অল্টম্যান ও পিটার থিয়েলের মতো পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যবিরোধী গবেষণায় আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন।
রাশিয়ার এই প্রকল্পে কোষীয় বার্ধক্য কমানোর জন্য জিন থেরাপি, ল্যাবে তৈরি অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং জীবন্ত টিস্যুর থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মতো প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রুশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, গবেষকরা ইতোমধ্যে মানুষের কার্টিলেজ ও ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন পুতিনের মেয়ে মারিয়া ভোরন্তসোভা এবং কুর্চাতোভ ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী মিখাইল কোভালচুক। কোভালচুকের মতে, ভবিষ্যতের বিজ্ঞান মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়মিত মেরামত ও প্রতিস্থাপন সম্ভব করবে, যা মানুষের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, প্রয়াত বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির খাভিনসন দাবি করেছিলেন, সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ ১২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে সক্ষম হতে পারে।
তবে রাশিয়ার এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মনে করছেন, প্রকল্পের অগ্রগতির দাবিগুলো এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফলাফলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাও কমে গেছে, যা গবেষণার গতি বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই দীর্ঘায়ু প্রকল্প শুধু বিজ্ঞান বা স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা, শক্তি ও রাজনৈতিক স্থায়িত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। শেষ পর্যন্ত, ইতিহাসের সব শাসকের মতো মৃত্যুর সীমাবদ্ধতাকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় ক্রেমলিনের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ।



