নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন আর নেই। ডিএনএর ডাবল-হেলিক্স গঠন আবিষ্কার করে জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটানো এই মার্কিন বিজ্ঞানী ৯৭ বছর বয়সে লং আইল্যান্ডের এক হসপিসে মৃত্যুবরণ করেন বলে জানিয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। ওয়াটসনের দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠান কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরি (CSHL) তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে।
১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিকের সঙ্গে মিলে ওয়াটসন ডিএনএর ত্রি-মাত্রিক ডাবল-হেলিক্স গঠন আবিষ্কার করেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার শুধু জিনতত্ত্বে নয়, পরবর্তী সময়ে জিন প্রকৌশল ও বায়োটেকনোলজির বিকাশেও বিপ্লব এনে দেয়। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬২ সালে তারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
ওয়াটসন ১৯২৮ সালের ৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক এবং পরে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক্সে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৫১ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে যোগ দিয়ে ক্রিকের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় অংশ নেন। তাদের আবিষ্কৃত ডিএনএর গঠনে দেখা যায়, এটি দুটি পাকানো সিঁড়ির মতো, যার ধাপ তৈরি হয় চারটি নিউক্লিওটাইড জোড়া দিয়ে। এই গঠন থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, কীভাবে জেনেটিক তথ্য এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।
১৯৯০ সালে ওয়াটসনকে মানব জিনোম প্রকল্পের (Human Genome Project) প্রধান করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল মানুষের সম্পূর্ণ জিনগত গঠন নির্ধারণ করা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH) কিছু জিন অনুক্রমের পেটেন্ট নিতে চাইলে তিনি এর বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেন। ওয়াটসনের বিশ্বাস ছিল—মানব জিনের জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ The Double Helix (১৯৬৮) প্রকাশের পর সহকর্মী ফ্রান্সিস ক্রিক ও মরিস উইলকিনস অভিযোগ তোলেন যে, বইটিতে গবেষণার গোপনীয়তা ভঙ্গ হয়েছে এবং সহকর্মীদের ভূমিকা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের এক্স-রে তথ্য ব্যবহারের পরও তাকে যথাযথ কৃতিত্ব না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জীবনের শেষভাগে জাতি ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ওয়াটসন সমালোচনার মুখে পড়েন। ২০০৭ সালে টাইমস অব লন্ডন–এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আফ্রিকানদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যার জেরে তাকে CSHL-এর চ্যান্সেলর পদ থেকে অপসারণ করা হয়। যদিও পরে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন, ২০১৯ সালে অনুরূপ মন্তব্য করে আবারও সমালোচিত হন।
ওয়াটসন ২০০৭ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে নিজের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করেন। তিনি বলেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে গর্বের অর্জন ডাবল হেলিক্স নয়, বরং তার লেখা বইগুলো। জীবনের শেষ দিকে তিনি Avoid Boring People নামের আত্মজীবনীমূলক বই লেখেন, যেখানে তিনি নিজের বিতর্কিত ও সাহসী জীবনদর্শন প্রকাশ করেন।



