একটি ছোট্ট খামারবাড়ি, একটি পুরোনো গাড়ি এবং মানবতা-বহুল হৃদয়—এই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করা হোসে ‘পেপে’ মুজিকার জীবনযাত্রা ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য উদাহরণ। উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মানবতাবাদী রাজনীতিক মুজিকা ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। খাদ্যনালির ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ এক বছরের লড়াই শেষে মে মাসের শুরুতে তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে নেওয়া হয়, সেখানেই শেষ হয় তার বর্ণাঢ্য জীবনের যাত্রা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ১৪ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
মুজিকার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন উরুগুয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি। তিনি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লেখেন, “গভীর দুঃখের সঙ্গে আমরা আমাদের কমরেড পেপে মুজিকার প্রয়াণের খবর জানাচ্ছি। তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট, রাজনৈতিক কর্মী, পথপ্রদর্শক ও নেতা। প্রিয় বন্ধু, আপনাকে আমরা খুব মিস করব।”
মার্কসবাদী-লেনিনবাদী গেরিলা গোষ্ঠী ‘তুপামারোস’ থেকে মূলধারার রাজনীতিতে তার উত্তরণ লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। সামরিক শাসনের সময় তিনি ১৩ বছর কারাবন্দি ছিলেন, যার অধিকাংশ সময় কেটেছে একটি অন্ধকার, নির্জন সেলে। সেই কঠিন সময় তার চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে। মুজিকা নিজেই বলেন, “আমি বিশ্বকে বদলাতে পারিনি, কিন্তু যা পড়েছিলাম, তা আমাকে নিজেকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে।”
২০০০ সালে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন, প্রথমে সিনেটর এবং পরে পশুপালনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে গর্ভপাত, সমকামী বিবাহ এবং গাঁজার ব্যবহার বৈধ করা হয়, যা তাকে বিশ্বব্যাপী উদারপন্থি নেতৃত্বের এক প্রতীক করে তোলে।
সরল জীবন ছিল মুজিকার বৈশিষ্ট্য। তিনি সরকারি বাসভবনে না থেকে মন্টেভিডিওর উপকণ্ঠের ছোট একটি খামারে থাকতেন, সাধারণ পোশাক পরতেন এবং রাষ্ট্রপতির বেতনের ৯০ শতাংশ দান করতেন দরিদ্রদের জন্য। তার একমাত্র বিলাসিতা ছিল ১৯৮৭ সালের একটি ফক্সওয়াগন বিটল। তাই মানুষ তাকে ডাকত ‘বিশ্বের সবচেয়ে গরিব প্রেসিডেন্ট’। যদিও তার নিজের ভাষায়, “আমি গরিব নই। গরিব সেই, যে অনেক কিছু চায় কিন্তু কিছুতেই সন্তুষ্ট নয়।”
তার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে বাম ও উদারপন্থি নেতারা শোক জানিয়েছেন। বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তাকে বলেছিলেন ‘প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার প্রতীক’, ব্রাজিলের সরকার তাকে ‘আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবতাবাদী’ আখ্যা দিয়েছে এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, “মুজিকা একটি উন্নত বিশ্বের জন্য বেঁচে ছিলেন।” গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট বার্নার্ডো আরেভালো তাকে বলেন, “নম্রতা ও মহত্ত্বের উদাহরণ।”
২০২০ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া মুজিকার খামারবাড়িটি এখনও তরুণ রাজনীতিকদের প্রেরণার স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। ভোগবাদবিরোধী মুজিকা একবার বলেছিলেন, “আমরা আত্মঘাতী সমাজ গড়ে তুলেছি। আমাদের কাজ করার সময় আছে, কিন্তু বাঁচার সময় নেই।”
মৃত্যুর আগে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যেন তাকে তার খামারেই তার প্রিয় কুকুরের পাশে সমাহিত করা হয়। তিনি রেখে গেলেন তার স্ত্রী লুসিয়া তোপোলানস্কিকে, যিনি ছিলেন তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী এবং গেরিলা আন্দোলনের সহযোদ্ধা। তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
মুজিকা ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমার চূড়ায় থেকেও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন। তার জীবন, দর্শন ও সরলতা আগামী প্রজন্মের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।



