সারা দিনের ক্লান্তি শেষে গভীর ঘুমে ঢোকার পর হঠাৎ পায়ের রগ বা মাংসপেশিতে তীব্র টান ধরে যাওয়া অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। এই অবস্থায় প্রচণ্ড ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায় এবং কয়েক মুহূর্তের জন্য পা নাড়ানোও কষ্টকর হয়ে ওঠে। ঘুমের মধ্যে এমন খিঁচ বা টান পড়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘মাসল ক্র্যাম্প’ বলা হয়। যদিও এটি বেশ সাধারণ সমস্যা, তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এটা কি স্বাভাবিক, নাকি কোনো রোগের ইঙ্গিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মধ্যে পায়ে টান পড়ার নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নেই। তবে স্নায়ু ও পেশির সমন্বয়হীনতা এই সমস্যার একটি প্রধান কারণ হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্নায়বিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে, ফলে রাতে পেশির ওপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে গিয়ে খিঁচ ধরার প্রবণতা বাড়ে।
এ ছাড়া পায়ের পেশিতে রক্ত সঞ্চালন কমে গেলে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়, যা খিঁচের কারণ হতে পারে। দিনের বেলা অতিরিক্ত হাঁটা, ভারী কাজ করা বা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার মতো শারীরিক চাপও রাতে পেশিতে টান ধরার ঝুঁকি বাড়ায়।
শরীরে পানি ও ইলেকট্রোলাইটের (সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম) ভারসাম্যহীনতা পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। শীতে বা গরমে পানি কম খাওয়া, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের অভাব এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ঠান্ডা বা হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রভাবেও পেশি সংকুচিত হয়ে খিঁচ ধরতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে পায়ে টান পড়া দীর্ঘমেয়াদি রোগের লক্ষণও হতে পারে। কিডনির জটিলতা থাকলে শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা পেশিতে টান সৃষ্টি করতে পারে। ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এটিকে ডায়াবেটিক নার্ভ ড্যামেজ বলা হয়—যার ফলেও পায়ে খিঁচ দেখা দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা পার্কিনসনসের মতো স্নায়বিক রোগেও এই ধরনের সমস্যা দেখা যায়।
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ পায়ে টান ধরলে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে ব্যথা কমানো সম্ভব। খিঁচ ধরা জায়গায় আলতোভাবে ম্যাসাজ করলে পেশি শিথিল হয়। পায়ের আঙুল নিজের দিকে টেনে ধরে স্ট্রেচিং করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। প্রয়োজনে গরম বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পানি পান করে শরীরের পানিশূন্যতা দূর করা এবং হালকা স্ট্রেচিং ব্যায়াম করাও উপকারী।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঘুমের মধ্যে পায়ের রগে টান পড়া সাধারণ সমস্যা হলেও একে অবহেলা করা ঠিক নয়। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। তবে সমস্যা যদি ঘন ঘন বা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।



