কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; ধীরে ধীরে তা দখল করে নিচ্ছে খেলাধুলার জগতও। বিশ্বজুড়ে এআই–নির্ভর প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ দেখে Google ও Microsoft–এর মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই নানা এআই–সেবা চালু করেছে। আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বে এই প্রযুক্তি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে ম্যাচ কৌশল নির্ধারণ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে খেলা এখন আর শুধু দক্ষতা বা আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেটা, অ্যালগরিদম এবং সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়—Cristiano Ronaldo যখন ফ্রি-কিক নেন, দর্শকরা যেখানে চোখ রাখেন গোলের দিকে, সেখানে প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে বলের গতি, ঘূর্ণন, বাতাসের চাপ ও শরীরের পেশির নড়াচড়া। একইভাবে Tour de France–এর মতো প্রতিযোগিতায় সাইক্লিস্টের শক্তি খরচ, গতির পরিবর্তন এবং শারীরিক সহনশীলতা পর্যন্ত পরিমাপ করা হচ্ছে সেন্সর ও ক্যামেরার মাধ্যমে। খেলোয়াড়দের শরীরে বসানো পরিধানযোগ্য ডিভাইস শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, ক্লান্তি কিংবা চোটের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করছে কোচ ও বিশ্লেষকদের।
খেলাধুলায় ডেটা ব্যবহারের ধারণাটি জনপ্রিয় হয় Moneyball সিনেমার মাধ্যমে, যেখানে Brad Pitt পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে একটি দল গঠনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তবে ২০২৬ সালে এসে সেই ধারণা আরও বহুদূর এগিয়েছে। এখন গ্যালারির ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য ছবি তুলে খেলোয়াড়দের প্রতিটি নড়াচড়া বিশ্লেষণ করছে, যেন মাঠের ভেতরে চলতে থাকা প্রতিটি মুহূর্তই একটি ডেটাসেট।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পোর্টস অ্যানালিটিকসের বাজার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং আগামী দশকে এটি বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান EY পূর্বাভাস দিয়েছে, ইউরোপের এই বাজারের আকার নাটকীয়ভাবে বাড়বে। টিভি সম্প্রচার, ফ্যান্টাসি লিগ, এমনকি অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মও এখন লাইভ ডেটার ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Genius Sports বিপুল অর্থে একটি বেটিং–সম্পর্কিত প্ল্যাটফর্ম অধিগ্রহণ করে দেখিয়েছে, তথ্যভিত্তিক ক্রীড়া ব্যবসা কতটা লাভজনক হয়ে উঠেছে।
তবে এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে এসেছে নতুন প্রশ্ন—খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানা ও গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হবে। পেশাদার চুক্তির মাধ্যমে অনেক সময় খেলোয়াড়রা নিজের অজান্তেই তাদের শারীরিক ও পারফরম্যান্স–সংক্রান্ত ডেটা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে দেন ক্লাব বা লিগকে। ফলে খেলাধুলা এখন একদিকে যেমন মাঠের লড়াই, অন্যদিকে তেমনি পর্দার আড়ালে চলছে ডেটা ও প্রযুক্তির এক নীরব প্রতিযোগিতা।
দিনশেষে দর্শকের চোখে ফুটবলারের ড্রিবলিং বা বোলারের গতির ঝড় যতই শিল্পের মতো মনে হোক না কেন, স্পোর্টস অ্যানালিটিকসের দুনিয়ায় তা পরিণত হচ্ছে কোটি ডলারের পরিসংখ্যানে। খেলার রোমাঞ্চ এখনও মানুষের দক্ষতায়, কিন্তু তার বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্ভুল গণনায়।



