পশুর চামড়া সংরক্ষণের একটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। নতুন এই পদ্ধতিতে লবণের পরিবর্তে পার অ্যাসিটিক অ্যাসিড ব্যবহার করে চামড়া এক মাসেরও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। তার সহ-গবেষক ছিলেন মাস্টার্স শিক্ষার্থী মো. নাদিম হাসান। গবেষণাটি ‘Salt-free Preservation of Animal Skin: An Eco-friendly Approach’ শিরোনামে আন্তর্জাতিক জার্নালে জমা দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল লবণের পরিবর্তে এমন একটি উপায় নির্ধারণ করা, যা পরিবেশবান্ধব ও খরচ সাশ্রয়ী হয় এবং চামড়ার গুণগত মানও বজায় রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, পার অ্যাসিটিক অ্যাসিড চামড়ার চর্বি ও অন্যান্য ময়লা দূর করে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে, যা ট্যানিংয়ের সময় ক্রোমিয়ামের প্রবেশে সহায়ক হয়। ফলে তুলনামূলকভাবে কম ক্রোমিয়াম ব্যবহার করেও কার্যকর ট্যানিং সম্ভব হয়। এতে করে ১১ গুণ কম ক্রোমিয়াম পরিবেশে নির্গত হয় এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতু প্রবেশের আশঙ্কাও হ্রাস পায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২ গ্রাম/লিটার ঘনমাত্রার পার অ্যাসিটিক অ্যাসিডে গরু ও ছাগলের চামড়া ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে চামড়ায় কোনো ধরনের পচন বা গঠনগত ক্ষতি দেখা যায়নি।
বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি খাসির চামড়া সংরক্ষণে প্রায় ৩০০-৫০০ গ্রাম লবণ ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশে লবণ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। নদী-নালা ও খালের পানিতে মিশে এটি জলজ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। অপরদিকে, পার অ্যাসিটিক অ্যাসিড ব্যবহারে এই দূষণ রোধ করা যায় এবং শ্রম ও খরচ উভয়ই কমে যায়।
গবেষকরা জানান, এই পদ্ধতিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশ-সচেতন ও কম খরচে চামড়া সংরক্ষণে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। গবেষণার প্রধান ড. তৌফিক আলম বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য চামড়া যাতে ট্যানিংয়ের আগ পর্যন্ত পচে না যায়, তা নিশ্চিত করা। পার অ্যাসিটিক অ্যাসিড এই কাজে অত্যন্ত কার্যকর। চামড়া ছাড়ানোর ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে এক মিনিট অ্যাসিড মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে বাতাসবিরোধী অবস্থায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে চামড়া দীর্ঘদিন ভালো থাকে।”
তিনি আরও বলেন, কোরবানির সময় এই পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করে এর উপকারিতা তুলে ধরা সম্ভব। এজন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, বিশেষ করে চামড়া সংরক্ষণকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও পার অ্যাসিটিক অ্যাসিড সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে। জেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ একযোগে কাজ করলে এটি সহজে বাস্তবায়নযোগ্য হবে।



