
জাতীয় সম্মাননা একুশে পদক-এর জন্য এবার নির্বাচিত হয়েছেন নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যশিক্ষক অর্থী আহমেদ। ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। অনেকে জানতে চাইছেন তাঁর কাজের বিশেষত্ব কী এবং কেন তিনি আলোচনায়।
অর্থী আহমেদ শুধু একজন পারফরমার নন; তিনি নৃত্যচিন্তার একটি ভিন্ন ধারার প্রবর্তক। তাঁর দর্শনে নাচ কেবল মঞ্চনির্ভর শিল্প নয়, বরং শরীর ও মনের সুস্থতার একটি কার্যকর মাধ্যম। তিনি নৃত্যকে “অল্টারনেটিভ ওয়েলবিইং থেরাপি” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।যা বাংলাদেশে নৃত্যচর্চার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।
এই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অর্থী আহমেদ ড্যান্স একাডেমি। এখানে নাচ শেখানো হয় আনন্দ, সহমর্মিতা ও আত্মসম্মানের পরিবেশে। বিশেষভাবে আলোচিত তাঁর ‘অ্যাডাল্ট বিগিনার্স ক্লাস’, যেখানে বয়সের সীমাবদ্ধতার সামাজিক ধারণাকে ভেঙে যেকোনো বয়সের মানুষকে নাচ শেখার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, দম্পতি, মা-শাশুড়ি। এমনকি একই পরিবারের তিন প্রজন্মও।
অর্থীর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ট্রমা-সংবেদনশীল নৃত্যচর্চা। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স সারভাইভার বা হ্যারাসমেন্টের অভিজ্ঞতায় নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া মানুষদের জন্য নাচকে তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর মতে, নাচ মানুষকে নিজের শরীরকে নতুনভাবে চিনতে, গ্রহণ করতে ও ভালোবাসতে শেখায়-যা মানসিক ক্ষত সারানোর এক নীরব কিন্তু গভীর প্রক্রিয়া।
ছোটবেলা থেকেই নাচের সঙ্গে যুক্ত অর্থী। সময়ের সঙ্গে নাচ তাঁর কাছে শুধু পারফরম্যান্স না থেকে হয়ে ওঠে আত্ম-অনুসন্ধানের ভাষা। দেশে-বিদেশে নৃত্যশিক্ষা, গুরুদের সান্নিধ্য এবং নৃত্যদর্শনের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয় যে নাচ আসলে একটি জীবনধারা। বিদেশে পড়াশোনা শেষে ২০১৮ সালের দিকে তাঁর মাথায় নাচকে বিকল্প সুস্থতা-চর্চা হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা স্পষ্ট হয়, যার বাস্তব রূপ একাডেমি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামনে আসে।
তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর দায়িত্ব শুধু পারফর্ম করা নয়- শিল্প শেখানো, সংরক্ষণ করা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে তিনি নৃত্যচর্চার পাশাপাশি গবেষণা ও শিক্ষাদানে আরও বেশি মনোযোগ দিতে চান, যাতে নাচকে মানসিক সুস্থতা ও মানবিক বিকাশের একটি গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
একুশে পদকের স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘদিনের কাজকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরল- তবে অর্থীর ভাষায়, মানুষের ভেতরে পরিবর্তন আনতে পারাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।
