বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের অন্যতম অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ষাটের দশকে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও অভিনেতা সনি রহমান।
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন নাসিমা খান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে অভিনয়ের মাধ্যমে যাঁরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বাংলা ও উর্দু ভাষার অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করে দর্শকদের কাছে পরিচিতি অর্জন করেন তিনি। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামের উকিলবাড়ি। তাঁর বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান এবং দাদা খান বাহাদুর আবদুল জলিল ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে তাঁদের পরিবার লালবাগে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করে।
নাসিমা খানের চলচ্চিত্রে আসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অভিনেতা আনিসের, যিনি খান আতা নামেও পরিচিত। নাসিমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকতেন আনিস এবং তাঁর বাবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল। একসময় আনিসই নাসিমার বাবাকে মেয়েকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। বাবার সম্মতি পাওয়ার পর অভিনয়জগতে পা রাখেন নাসিমা।
১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। ঢাকার চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ এই সিনেমায় সহনায়িকাদের একজন ছিলেন নাসিমা খান। ছবিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পুরস্কার অর্জন করে। একই বছর বেবী ইসলাম পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘তানহা’য় অভিনয় করেন তিনি। এতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন শবনম, সুমিতা দেবী ও লাহোরের অভিনেত্রী শামীম আরা।
১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন নাসিমা খান। সিনেমাটিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন আনিস। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচিতি আরও বাড়িয়ে তোলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘সূর্যস্নান’, ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। এসব সিনেমায় বিভিন্ন সময়ে আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, মুস্তফা, আজিম ও হারুনের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
‘আসবন গ্যায়ে মতি’ চলচ্চিত্রেও অভিনয়ের মাধ্যমে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন নাসিমা খান। বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ষাটের দশকের ঢাকার চলচ্চিত্রজগতের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্রে কাজ করার পর তাঁকে নাটকে বেশি দেখা যায়। সময়ের পরিবর্তনে অভিনয়ের মাধ্যম বদলালেও শিল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেছিলেন, নাসিমা খান ছিলেন তাঁদেরই একজন। তাঁর মৃত্যুতে ঢাকার চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।



