ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও নির্ভরতার গল্পগুলো আমাদের নরম করে তোলে। কিন্তু সাভারের কলমা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বিশ্বাসের সেই গভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যেখানে এক স্ত্রী নিজের কিডনি দিয়ে স্বামীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন, সেই স্বামীই পরবর্তীতে জড়িয়েছেন পরকীয়ায়, নির্যাতন করেছেন স্ত্রীকে এবং এখন স্ত্রী একা লড়ছেন তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।
৩৫ বছর বয়সী উম্মে সাহেদীনা টুনির জীবন যেন সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয় ও হৃদয়বিদারক। ২০০৬ সালে মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. তারেকের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন টুনি। ২০০৭ সালে তাদের ঘর আলো করে আসে একমাত্র সন্তান আজমাইন দিব্য। কিন্তু ২০০৮ সালে তারেকের ধরা পড়ে জটিল কিডনি রোগ। উভয় কিডনিই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, নিয়মিত ডায়ালাইসিস না করালে তার মৃত্যু অনিবার্য।
পরিবার ও সমাজ যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন একমাত্র সঙ্গী হয়ে পাশে দাঁড়ান স্ত্রী টুনি। স্বর্ণালংকার, নিজের আয় এমনকি মায়ের পেনশনের অর্থ খরচ করে স্বামীর চিকিৎসা চালিয়ে যান তিনি। ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতের দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করেন তিনি। সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তারেক সুস্থ হয়ে ওঠেন। টুনি ভেবেছিলেন, এখন হয়তো তারা আবার নতুন করে বাঁচবেন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভয়ংকর। সুস্থ হওয়ার পরপরই বদলে যান তারেক। ঢাকায় ফিরে তিনি জড়িয়ে পড়েন অনলাইন জুয়া ও পরকীয়ায়। স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করেন, এমনকি শারীরিক নির্যাতনও চালান। একপর্যায়ে টুনিকে বাড়ি থেকে বের করে দেন এবং বসবাস শুরু করেন তার ডিভোর্সি প্রেমিকা তাহমিনা মেরির সঙ্গে।
২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি টুনি সাভার থানায় অভিযোগ করেন। যদিও তারেক কৌশলে মুচলেকা দিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহার করান। কিন্তু নির্যাতন বাড়তে থাকায় টুনি ২২ এপ্রিল ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারী নির্যাতন ও যৌতুক আইনে মামলা করেন। পরে ২৪ এপ্রিল তারেক গ্রেপ্তার হলেও ৪ জুন জামিনে মুক্তি পান এবং এরপর আত্মগোপনে চলে যান। তিনি টুনির ওপর ডিভোর্স ও বাড়ি নিজের নামে লিখে দেওয়ার চাপ দিতে থাকেন।
টুনি জানান, কিডনি দানের পর তিনি সাত দিন আইসিইউতে ছিলেন, আর সেখানেই স্বামী তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। সুস্থ হতেই তিনি বদলে যান। এখন টুনির একটাই চাওয়া—এই প্রতারক যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।
পাশের মানুষ ও প্রতিবেশীরাও বলেন, টুনি যেভাবে স্বামীকে আগলে রেখেছেন, নিজের কিডনি পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছেন—এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বিরল। অথচ সেই মানুষটিই আজ তাকে নির্যাতন করছে, অন্য নারীর সঙ্গে সংসার করছে।
টুনির মা বলেন, “আমার পেনশনের সব টাকা তার চিকিৎসায় দিয়েছি, আর আজ সেই ছেলে আমার মেয়েকে ঘরছাড়া করেছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”
টুনির আইনজীবী অ্যাডভোকেট নেহার ফারুক জানান, তারেক শুধুমাত্র নারী নির্যাতনই নয়, বরং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনেরও গুরুতর লঙ্ঘন করেছেন। প্রতারণার মাধ্যমে স্ত্রীর কিডনি নিয়ে পরে তার ওপর অত্যাচার করেছেন। চার্জশিট পাওয়ার পর তার জামিন বাতিলের আবেদন করা হবে।
বর্তমানে জামিনে মুক্ত হয়ে তারেক আত্মগোপনে রয়েছেন। নম্বর পরিবর্তন করে গা-ঢাকা দিয়েছেন, ফলে তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না।



