লিবিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাহারা মরুভূমিতে অবস্থিত টাকার্করি (Takarkori) নামক প্রাচীন পাথুরে আশ্রয়স্থল থেকে দুটি প্রাকৃতিকভাবে মমিকৃত মানবদেহ আবিষ্কারকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনতত্ত্ব গবেষণায় নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণা-তথ্য অনুযায়ী, এই মমিগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা বর্তমান সাব-সাহারান আফ্রিকার পরিচিত জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরাসরি মিলে না। ফলে সাহারা অঞ্চলের প্রাচীন মানব ইতিহাস ও জনবসতি নিয়ে নতুন ব্যাখ্যার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা জানান, আবিষ্কৃত দেহ দুটি প্রায় ৭ হাজার বছর পুরোনো এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল। মরুভূমির শুষ্ক আবহাওয়া ও পাথুরে আশ্রয়স্থলের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেহগুলো স্বাভাবিকভাবেই মমির মতো সংরক্ষিত থাকে। আধুনিক ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নমুনা পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, এদের জিনগত গঠন বর্তমান সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রচলিত জিনধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। এতে ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, সাহারা অঞ্চলে একসময় একটি স্বতন্ত্র ও আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানবগোষ্ঠীর বসবাস ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কারের গুরুত্ব আরও বেশি কারণ—আজকের সাহারা মরুভূমি অতীতে এমন ছিল না। প্রায় ১০ হাজার থেকে ৫ হাজার বছর আগে পর্যন্ত সময়কে অনেক গবেষক “গ্রিন সাহারা” পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন। তখন এই অঞ্চল ছিল সবুজ তৃণভূমি, হ্রদ, নদী ও বন্যপ্রাণীতে সমৃদ্ধ। জলবায়ু ছিল তুলনামূলক আর্দ্র এবং মানব বসতির জন্য উপযোগী। পরে ধীরে ধীরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অঞ্চলটি শুষ্ক হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়, এবং মানবগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
টাকার্করি এলাকাটি আগে থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। সেখানে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক ও প্রাথমিক পশুপালক সমাজের নিদর্শন, খাদ্যাভ্যাসের চিহ্ন, পাথরের সরঞ্জাম এবং শিলা-চিত্র (rock art) পাওয়া গেছে। নতুন এই ডিএনএ গবেষণা সেই প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যকে জিনগত প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ডিএনএ ফলাফল থেকে বোঝা যায়—প্রাচীন সাহারার জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বর্তমান ধারণার চেয়েও বেশি ছিল। একই সঙ্গে এটি আফ্রিকার উত্তরাংশ, সাহেল অঞ্চল এবং সাব-সাহারান অঞ্চলের মধ্যে প্রাচীন মানব অভিবাসন ও মিথস্ক্রিয়ার ধরণ নতুন করে মূল্যায়নের দরজা খুলে দিয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, মাত্র দুটি মমির ডিএনএ থেকে পুরো অঞ্চলের ইতিহাস চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যাবে না। আরও নমুনা, বিস্তৃত জিনগত বিশ্লেষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য একত্রে মূল্যায়ন করলে ভবিষ্যতে আরও পরিষ্কার চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার্করির এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ঘটনা নয়—এটি সাহারার অতীত পরিবেশ, মানব অভিযোজন এবং বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।



