দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বেসরকারি পরিবেশবাদী গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা টুথপেস্টের ৭৬.৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার সময় এসব অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা অজান্তেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের এমন ক্ষুদ্র কণা, যার আকার সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম। এগুলো খালি চোখে সহজে দেখা যায় না এবং পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত হয়। উৎসের ভিত্তিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দুই ধরনের—প্রাথমিক (Primary Microplastics), যা ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট আকারে তৈরি করা হয় এবং মাধ্যমিক (Secondary Microplastics), যা বড় প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে বা ক্ষয় হয়ে তৈরি হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, কিছু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করে। এগুলো দাঁত পরিষ্কারের স্ক্রাবিং বা পলিশিং এজেন্ট হিসেবে, টুথপেস্টের ঘনত্ব ও গঠন ঠিক রাখতে এবং পণ্যের রঙ ও স্থায়িত্ব বাড়াতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কম খরচে পণ্যের ওজন বৃদ্ধি করতেও কিছু ক্ষেত্রে এই প্লাস্টিক কণা যুক্ত করা হয়। ইএসডিওর গবেষণায় পরীক্ষিত ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে এবং প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) জানিয়েছে, টুথপেস্ট তৈরির জন্য অনুমোদিত উপাদানের তালিকায় এখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) মুখগহ্বর পরিচর্যার পণ্যে ‘শূন্য প্লাস্টিক উপাদান’ নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের মতে, যেসব পণ্য সরাসরি মানুষের মুখ ও খাদ্যচক্রের সংস্পর্শে আসে, সেখানে সিন্থেটিক নন-বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের নিরাপদ মাত্রা বলে কিছু নেই।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, টুথপেস্টে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লাস্টিক পলিমারের মধ্যে রয়েছে পলিইথিলিন (PE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (PET) এবং পলিমিথাইল মিথাক্রাইলেট (PMMA)। এগুলো দাঁত পরিষ্কার, টুথপেস্টের ঘনত্ব বজায় রাখা এবং আকর্ষণীয় টেক্সচার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে মূলত তিনটি পথে প্রবেশ করে—খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এবং ত্বকের সংস্পর্শে। তবে টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় এসব কণা সরাসরি মুখগহ্বর দিয়ে শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি বেশি থাকে। ব্রাশ করার সময় অজান্তেই কিছু প্লাস্টিক কণা গিলে ফেলা হয়, যা পাকস্থলী ও অন্ত্রে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তারা অনেক সময় টুথপেস্ট পুরোপুরি ফেলে দিতে পারে না।
বিভিন্ন গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ব্রাশ করার সময় মাইক্রোপ্লাস্টিক দাঁতের ফাঁক ও মাড়ির টিস্যুতে আটকে থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মাড়িতে প্রদাহ, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, কোষের ক্ষতি এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইএসডিওর গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মুখের নরম শ্লেষ্মা ঝিল্লির মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করতে পারে এবং প্লাস্টিকে থাকা রাসায়নিক উপাদান হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে বিভিন্ন অঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ব্যবহৃত টুথপেস্টের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করা একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং টুথপেস্টে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের পরিবর্তে নিরাপদ ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।



