বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ-এর ৭৭তম জন্মদিন আজ। কোটি পাঠকের প্রিয় এই সাহিত্যজাদুকরের জন্মদিন উপলক্ষে তার প্রিয় আবাস গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে আয়োজন করা হয়েছে নানা কর্মসূচি। মোমবাতি প্রজ্বালন, কেক কাটা ও কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে দিনভর তাকে স্মরণ করছেন পরিবারের সদস্য ও অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী।
নুহাশ পল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, জন্মদিন উদযাপন শুরু হয় রাত ১২টা ১ মিনিটে পুরো পল্লীজুড়ে মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে। মোট ১ হাজার ৭৭টি মোমবাতি জ্বালানো হয়। এরপর লেখকের সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন, ছেলে নিশাত ও নিনিতকে সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন। সকালে হুমায়ূন আহমেদের সমাধিতে কেক কাটা ও কবর জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা অব্যাহত থাকে।
লেখকের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর, নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে, তার নানাবাড়িতে। ছোটবেলায় তার ডাকনাম ছিল ‘কাজল’। তার বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও লেখক, যিনি ১৯৭১ সালে শহীদ হন। বাবার বদলিজনিত কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাটে হুমায়ূনের শৈশব ও শিক্ষাজীবন।
তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে অনার্স ও এমএসসি সম্পন্ন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ দিয়েই সাহিত্যজগতে আলোড়ন তোলেন হুমায়ূন আহমেদ। এরপর একে একে সৃষ্টি করেন অসংখ্য জনপ্রিয় উপন্যাস, গল্প, নাটক ও চলচ্চিত্র। তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে — শঙ্খনীল কারাগার, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, বাদশা নামদার ও মাতাল হাওয়া। তার সৃষ্ট কালজয়ী চরিত্র হিমু, মিসির আলি, রূপা ও শুভ্র আজও বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে জীবন্ত।
বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের জগতে হুমায়ূন আহমেদের অবদানও অসামান্য। তার রচিত জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য — এইসব দিনরাত্রি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার ও নক্ষত্রের রাত। চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। তার পরিচালিত আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, শ্যামল ছায়া ও ঘেটুপুত্র কমলা — প্রতিটি চলচ্চিত্রই সমালোচক ও দর্শকপ্রিয়তার দিক থেকে সাফল্য অর্জন করে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা লাভ করেন।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই প্রিয় সাহিত্যিক মৃত্যুবরণ করেন। তাকে তার প্রিয় নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় সমাহিত করা হয় — যেখানে আজও জ্বলজ্বল করছে হাজার মোমের আলোয় তার অমলিন স্মৃতি।



