দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক সেবন করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ। এছাড়া ইয়াবা বা মেথামফেটামিন, অ্যালকোহল, কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনের মতো মাদকও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই গবেষণায় সিগারেটকে মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তবুও অবৈধ মাদকে আসক্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
রোববার (২৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে “বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক হাসান মারুফ। গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন বিএমইউর অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী। ডিএনসির তত্ত্বাবধানে বিএমইউ ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করে, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এতে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলার তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ ও কিশোর বয়সী। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮–১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেন, আর ৫৯ শতাংশের শুরু ১৮–২৫ বছর বয়সে। বিভাগভেদে ব্যবহারের হারেও পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি (৬.০২ শতাংশ), এরপর রয়েছে রংপুর (৬ শতাংশ), চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ), খুলনা (৪.০৮ শতাংশ) ও রাজশাহী (২.৭২ শতাংশ)। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে—প্রায় ২২.৯ লাখ, এরপর চট্টগ্রামে ১৮.৮ লাখ এবং রংপুরে ১০.৮ লাখ।
মাদকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাঁজার পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ) এবং অ্যালকোহল (প্রায় ২০ লাখ)। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যারা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশাকে মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক সহজলভ্য হওয়াই আসক্তির অন্যতম কারণ। যদিও অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধার অভাবে বেশিরভাগই সফল হননি। মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যবহারকারী কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক সমস্যা এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, এটি গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি রাজনৈতিক পর্যায়ে দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, প্রাথমিক পর্যায়ে মাদকাসক্তিকে শনাক্ত করে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা গেলে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। তিনি জানান, ডিএনসি বর্তমানে সরবরাহ কমানো, চাহিদা কমানো এবং ক্ষতি হ্রাস—এই তিনটি স্তরে কাজ করছে এবং গবেষণার সুপারিশ কাজে লাগিয়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।



