বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক মান্নার প্রথম প্রেম শুরু হয়েছিল কৈশোরে, নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। টাঙ্গাইলের এক মেয়ের প্রতি তার ভালো লাগা জন্মেছিল, যা টানা এক বছর চলেছিল। তবে সেই ভালোবাসার ইতি ঘটে হঠাৎ করেই, কারণ মেয়েটির হঠাৎ বিয়ে হয়ে যায়। মান্না সরলভাবে বলেন, “এরপর আর ওটা নিয়ে ভাবিনি।”
তবে কলেজজীবনে মেয়েদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল শুধুই মজার ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “সিরিয়াস কোনো সম্পর্ক হয়নি, এই যেমন—‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না’ বা ‘তোমার জন্য ঘুম হয়নি’ এমন কোনো কথা আমি বলিনি।” কোনো মেয়ে যদি ভালো লাগত, তখন তিনি খোলামেলাভাবে বলতেন, “তোমাকে আমার ভালো লাগে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ব্যস।” এর বেশি বলা না পারার কারণ হিসেবে তিনি নিজের ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেন।
মান্নার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায় ছিল প্রেম করে বিয়ে। প্রথম দেখায়ই তিনি তার স্বভাবসুলভ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “আপনাকে আমার ভালো লাগে, আপনাকে আমি ভালোবাসি।” তার স্ত্রী শেলী মান্না প্রথমে কিছু না বললেও পরে স্বীকার করেন, সেই প্রস্তাব তাকে মনে হয়েছিল “একজন থার্ডক্লাস ছেলের আগমন”। প্রস্তাবের পর বিদায় নিতে নিতে মান্না তাকে প্রশ্ন করেন, “আপনি কী করেন?” জানতে পারেন, তিনি একটি এয়ারলাইন্সে চাকরি করেন। তখন মজার ছলে বলেন, “আপনি অনেক দেশে ঘোরেন। আমার জন্য জুতা কিনে আনবেন!”
শেলী মান্নার চলচ্চিত্রে আসার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের পেশায় ফিরে যান। মান্নার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি একটি ছবির জন্য মাত্র ৭–৮ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেতেন। ঢাকায় ভালো জায়গায় বাসা নেওয়াও তার পক্ষে কঠিন ছিল। ঠিক তখনই তার স্ত্রী সব ধরনের সহযোগিতা করেন। মান্না বলেন, “কাপড় থেকে খাওয়া-দাওয়া, এমনকি বিদেশে যাওয়াও—সব কিছুতেই স্ত্রী পাশে ছিলেন।”
চলচ্চিত্রে ধীরে ধীরে শক্ত অবস্থান তৈরি করে মান্না নিজের উপার্জনে বাড়ি-গাড়ি কিনেন এবং গড়ে তোলেন সুখের সংসার। তার স্ত্রী বর্তমানে ‘কৃতাঞ্জলী চলচ্চিত্র’ নামের প্রযোজনা সংস্থাটি দেখাশোনা করেন, যা মান্নার প্রতিষ্ঠিত ছিল।
২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৪৪ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন মান্না (প্রকৃত নাম: সৈয়দ মোহাম্মদ আসলাম তালুকদার)। তার মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রে নেমে আসে গভীর শোক। তার একমাত্র সন্তান সিয়াম ইলতিমাস মান্না বর্তমানে কানাডায় পড়াশোনা করছেন এবং বাবার পথ অনুসরণ করে চলচ্চিত্র জগতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এই গল্প শুধুমাত্র একজন নায়কের নয়, এটি একজন ভালোবাসার মানুষ, দায়িত্বশীল স্বামী ও কৃতজ্ঞ সন্তানের গল্প—যার জীবন যেমন পর্দায় ছিল বীরত্বপূর্ণ, বাস্তবেও তেমনি ছিল মানবিক ও হৃদয়ছোঁয়া।



