বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে গত এক দশকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের জরিপে যেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি, সেখানে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে। অর্থাৎ ১০ বছরে সুন্দরবনে ১৯টি বাঘ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১৭টি বাঘের উপস্থিতি রয়েছে বলে বন বিভাগের জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিরাপদ অস্তিত্ব এখনো নানা হুমকির মুখে। সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর সমন্বয়কারী মো. নুর আলম শেখ জানান, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন কারণে ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টি বাঘ শিকার বা পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ৩০টি বার্ধক্য কিংবা অসুস্থতায় মারা গেছে এবং তিনটি প্রাণ হারিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরিণ শিকার, বনদস্যুদের তৎপরতা, অবৈধ শিকার এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এখনো বাঘের জন্য বড় হুমকি। সম্প্রতি হরিণ ধরার ফাঁদে একটি বাঘ আটকা পড়ার ঘটনাও এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক সামিউল হক বলেন, একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের জন্য ৬০ থেকে ১৫০ বর্গকিলোমিটার এবং একটি স্ত্রী বাঘের জন্য ২০ থেকে ৬০ বর্গকিলোমিটার বিচরণক্ষেত্র প্রয়োজন। তবে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশেষ করে হরিণ ও বুনো শূকরের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে তুলনামূলক ছোট এলাকাতেও বাঘ টিকে থাকতে পারে। তিনি বাঘ সংরক্ষণে হরিণ শিকার বন্ধ, বন ধ্বংস রোধ, শিকার ও পাচারবিরোধী আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং ক্যামেরা ট্র্যাপ ও রেডিও কলারের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ডিসিপ্লিন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন বলেন, মানুষের অতিরিক্ত বিচরণ ও আবাসস্থলের সংকট বাঘের প্রজননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই সুন্দরবনে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ কমিয়ে বাঘের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা জরুরি।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। বাঘের সংখ্যা আরও বাড়াতে বন বিভাগ হরিণ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৩৫ জন হরিণ পাচারকারীর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতির পেছনে বনের সুবিধাভোগী একটি চক্র জড়িত। তিনি জানান, সরকার বনদস্যু দমন, হরিণ পাচারবিরোধী অভিযান এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। সম্প্রতি শিকারিদের ফাঁদে আহত একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ছয় মাস চিকিৎসা দিয়ে পুনরায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের ‘কিস্টোন’ বা প্রধান প্রজাতি। তাই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় শুধু বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, তাদের নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থাও সমানভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



