হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২–১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন, যা হামকে সবচেয়ে দ্রুত ছড়ানো রোগগুলোর শীর্ষে রাখে। করোনা বা ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়েও হাম দ্রুত ছড়ায়। ভাইরাসটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি স্থান ত্যাগ করার পরও কিছু সময় পরিবেশে সক্রিয় থাকে। তাই টিকা না থাকলে অল্প সময়েই বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সাধারণত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। ভিটামিন এ জটিলতা কমাতে সাহায্য করে। হামের সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতা হলো মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) বা এসএসপিই, যা খিঁচুনি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অস্বাভাবিক আচরণ এবং বাচন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই হামকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সময়মতো টিকা গ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। মাস্ক ব্যবহার কিছু সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু এটি টিকার বিকল্প নয়।
হামের টিকা (এমএমআর) অত্যন্ত কার্যকর। টিকা তৈরিতে হাম ভাইরাসকে ল্যাবরেটরিতে দুর্বল করে ফেলা হয়, যাকে লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন বলে। এই দুর্বল ভাইরাস রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, বরং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। দুই ডোজ টিকা নিলে প্রায় ৯৭% সুরক্ষা পাওয়া যায়। টিকা না নিলে শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। শুধু শিশু নয়, বড়দেরও হাম হতে পারে—বিশেষ করে যাদের টিকা নেওয়া নেই বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষম কম। প্রাপ্তবয়স্করাও এমএমআর টিকা নিতে পারেন, বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষার্থী, বিদেশযাত্রী ও যারা ভিড়ের মধ্যে কাজ করেন।
হামের টিকা আবিষ্কারের ইতিহাস চাঞ্চল্যকর। ১৯৫৪ সালে জন এফ. এন্ডার্স ও তাঁর সহকর্মীরা ডেভিড এডমনস্টন নামের এক অসুস্থ শিশুর রক্ত থেকে হাম ভাইরাস আলাদা করেন। ১৯৬৩ সালে এন্ডার্স জিনগতভাবে দুর্বল ‘এডমনস্টন-বি স্ট্রেইন’ ব্যবহার করে প্রথম সফল টিকা তৈরি করেন। পরে এমএমআর টিকা (হাম-মাম্পস-রুবেলা) উদ্ভাবিত হয়। এন্ডার্স পোলিও টিকা আবিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। হামের টিকা এখন পর্যন্ত কোটি কোটি শিশুকে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা করেছে—এটি বিজ্ঞানের এক মাইলফলক।
ডা. সাঈদ এনাম (ডিএমসি, বিসিএস) সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি; ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন।



