মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা অভিযানের অংশ হিসেবে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো মানসিক স্বাস্থ্যের এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের দশটিরও বেশি দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে এবার বাংলাদেশে এসেছে সাইকেল ইনক (Psycle INC)। বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট মোকাবেলায় তারা যে অভিযান চালিয়ে আসছেন, বাংলাদেশ এই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হলো। গত শনিবার (১৩ জুন, ২০২৬) ঢাকার আফতাবনগরের ‘সান্ড্রা হাউজ’-এ অনুষ্ঠিত হয় মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক বিশেষ আয়োজন ‘গো মেন্টাল হেলথ’।
বিশ্বের একটি দেশ থেকে আরেকটি দেশে ছুটে চলা এই দলটির লক্ষ্য একটাই—মানুষকে বোঝানো যে মানসিক স্বাস্থ্য কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং এটি নিয়ে কথা বলা মানেই সাহস। দীর্ঘ এই বৈশ্বিক যাত্রার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এসে তারা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা এদেশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার চর্চায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিকাল ৪টা থেকে রাত সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তৃতামঞ্চ, ছিল না কোনো রাজনৈতিক বার্তা। এই অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণরূপে মানুষের জন্য, মানুষের কাছাকাছি আসার জন্য।
জয়সান ইয়োগা অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের তত্ত্বাবধানে যোগব্যায়াম ও মাইন্ডফুল মেডিটেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরবর্তীতে বডি মুভমেন্ট প্র্যাকটিস, সৃজনশীল নৃত্য এবং ব্যান্ড সংগীতের আয়োজন পুরো পরিবেশকে এক অনন্য আনন্দমুখর রূপ দেয়। সাধারণ নগরবাসী থেকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ—সবাই একই ছাদের নিচে এক হয়েছিলেন।
একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “নগর জীবনের একটানা ব্যস্ততায় কোথাও যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখানে এসে বুঝলাম, যত্ন নেওয়াটা শুধু শরীরের জন্য নয়, মনেরও প্রয়োজন আছে। একসাথে যোগ ব্যায়াম আর গান—এই সহজ আনন্দগুলো যে এত বড় শক্তি দিতে পারে, তা আগে ভাবিনি।”
আরেকজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো অনেক ভুল ধারণা আর ট্যাবু আছে। এ ধরনের ঘরোয়া, উষ্ণ আয়োজন সেই দেয়াল ভাঙতে সাহায্য করে। এখানে এসে অনুভব করলাম—আমি একা নই।”
অনুষ্ঠানে প্রধান আয়োজক আরিফুল ইসলাম বলেন, “প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন মানুষ আত্মহত্যা করছেন । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রতি চারজন মানুষের একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন। এই বাস্তবতায় আমরা শুধু সচেতনতার বক্তৃতা দিতে আসিনি। আমরা এসেছি একটু পাশে দাঁড়াতে। কারণ গবেষণা বলছে, অনেক সময় একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আরেকজন মানুষের উপস্থিতি।”
তিনি আরও জানান, ইউরোপ, আমেরিকা সফরের এই অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছেন, সারা বিশ্বে মানসিক একাকীত্ব একটি সার্বজনীন সংকট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। তবে এই দেশের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সংযোগের যে সহজাত শক্তি আছে, সেটাকেই তারা মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চান।
এই বৈশ্বিক অভিযানে সাইকেল ইনকের (Psychle INC) সহযোগী হিসেবে রয়েছে ৪এম টিভি ইউএসএ (4M TV USA), ৪এম ভার্চুয়াল ক্লিনিক (4M Virtual Clinic), ওয়াক টু সেরেনিটি (Walk To Serenity), লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড রিট্রিট (Lost And Found Retreat) এবং ঢাকা ওয়াশিংটন নিউজ নেটওয়ার্ক (DWNN)।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ঢাকায় এই সফল আয়োজনের পর তারা আশাবাদী যে বাংলাদেশের অন্যান্য শহর ও জেলাতেও এ ধরনের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সংস্কৃতি তৈরি করতে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সুস্থতার চর্চা স্বাভাবিক করে তুলতে তারা স্থানীয় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করতে আগ্রহী।
দশেরও বেশি দেশ পেরিয়ে আফতাবনগরের এক বিকেলে এসে আরিফ ও তাঁর দল যে বার্তা রেখে গেলেন, তা সহজ কিন্তু গভীর: মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি মানুষের অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হলো—একে অপরের পাশে থাকা।



