বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ তুলে ধরতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের তৈরি ১৬টি এআইভিত্তিক প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও নগর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তুলে ধরা হয় এসব প্রকল্পের মাধ্যমে। সামিটে বিশ্ববিদ্যালয়টি ডায়মন্ড স্পন্সর হিসেবেও সহযোগিতা করে। পাশাপাশি ড্যাফোডিল গ্রুপের পক্ষ থেকে এআই প্রফেসর, পারফেক্ট এইচআর, এডুভিএএস, লিডারশিপ ওএস এবং স্টুডেন্ট ৩৬০ নামের পাঁচটি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত সমাধান প্রদর্শন করা হয়।
সামিটের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। উদ্বোধনের পর তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্যাভিলিয়ন পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার্থীদের তৈরি প্রকল্পগুলো ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন এবং বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এসব প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতেও এ ধরনের সম্ভাবনাময় প্রকল্প নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেন।
সামিটে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ফকির মাহবুব আনাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডিজিটাল রেডিনেস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক আলমগীর হোসেনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
সামিটের তৃতীয় অধিবেশন ‘এআই ফর এভরিওয়ান: সলভিং রিয়েল প্রবলেমস উইথ লোকাল ইন্টেলিজেন্স’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ। এতে মূল আলোচকদের একজন হিসেবে অংশ নেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ড. মো. সবুর খান। তিনি ব্যবসা ও শিল্পক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
অধিবেশনে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এআই এজেন্টের ব্যবহারিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। ডিজিটাল সহকর্মী হিসেবে এআই এজেন্ট ব্যবহার করে অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ, লেনদেন সমন্বয় এবং শিল্পক্ষেত্রের বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত করে সম্ভাব্য সমাধান তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তবে এসব প্রযুক্তির কার্যকর ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য যথাযথ মানবীয় তদারকির প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
সামিটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা তুলে ধরা হয়। জিডিপিতে অবদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন, অর্থায়ন, কৃষি ও সেবাসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে এ খাতের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জগুলোও উঠে আসে। আলোচনায় বলা হয়, এআই উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ধরনে পরিবর্তন, অ্যালগরিদমের পক্ষপাত, ডিপফেক এবং বিদেশি ক্লাউড ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার কারণে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়েও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সামিটের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা, উদ্ভাবন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের একত্র করে বাংলাদেশে একটি সমন্বিত এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পথ তৈরি করা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনা থেকে বাস্তব প্রয়োগের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সামিটে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তিনটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের তৈরি মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রদর্শন করেন ‘ওবিই আই’, যা এআইয়ের মাধ্যমে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান যাচাই ও কোর্সের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে। এ ছাড়া ছিল ইসলামি জ্ঞান ও গবেষণাসহায়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ইমাম এআই’, মাটির স্বাস্থ্য মূল্যায়নে সংবেদক ও এআইনির্ভর প্রযুক্তি ‘নিউট্রিসয়েল’, ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তকরণে ‘ডেঙ্গুক্লাস্টার এআই’, তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য পূর্বাভাসভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ‘শিল্প এআই ইআরপি’ এবং দক্ষতা শনাক্তকরণ ও প্রতিভাবান ব্যক্তিদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করার প্ল্যাটফর্ম ‘ইয়োফ্লেয়ার’।
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থাপন করেন ‘ফিফথআই এআই’, একটি বুদ্ধিমান পরীক্ষা মূল্যায়ন প্ল্যাটফর্ম; ‘নিউরোক্লাস্টার এআই’, এআইনির্ভর এমআরআই বিশ্লেষণ ও হাসপাতালের কম্পিউটিং ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক ডিজিটাল উদ্যোগ ‘ক্লিনিকবিডি’।
অন্যদিকে, কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রদর্শন করেন ‘আরবর’, কথা বলতে অক্ষম মায়েদের জন্য কণ্ঠস্বরভিত্তিক যোগাযোগ প্রযুক্তি; ‘প্রহরী এআই’, পর্দা পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য ঘটনা শনাক্তকরণে সহায়ক ব্যবস্থা; ‘স্মার্টবর্ডার’, আকাশভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও ভূমিতে আগাম সতর্কতা প্রদানের প্রযুক্তি; এবং নির্মিত অবকাঠামোর জন্য বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘আর্কিমাইন্ড এআই’। এ ছাড়া ছিল গ্রাহকের তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ও গোপনীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া ‘লিডজিনিয়াস এআই’, উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাখ্যাযোগ্য এআইভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা ‘ইয়ন’ এবং ‘কুপি’।
শিক্ষার্থীদের তৈরি প্রকল্পগুলোতে হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা, সমস্যা সমাধানভিত্তিক উদ্ভাবন এবং শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অ্যাকাডেমিক জ্ঞানের সমন্বয়ের প্রতিফলন ঘটেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন খাতের স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর উপযোগী প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরিতে তরুণদের আগ্রহ ও সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেছে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালেই চলবে না; প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, দায়িত্বশীল উদ্ভাবন, নৈতিকতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা। বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ, ডায়মন্ড স্পন্সর হিসেবে সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে দেশের এআইভিত্তিক উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে তাদের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।



