জুন মাসে একের পর এক ভূমিকম্পে কেঁপেছে বাংলাদেশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, আলোচিত চারটি ভূমিকম্পই অনুভূত হয়েছে রাতের বেলায়—যার মধ্যে তিনটিই ঘটেছে রাত ৯টা ৩০ মিনিটের আশপাশে। সর্বশেষ নরসিংদী কেন্দ্রিক ভূমিকম্পে আবারও কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকা; বহুতল ভবনে বসবাসকারী মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। ২২ জুন রাত ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে আঘাত হানে এই কম্পন, যা রাজধানীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ভলকানো ডিসকভারের তথ্য অনুযায়ী, এর মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ এবং উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৬ কিলোমিটার গভীরে। অন্যদিকে ইউএসজিএস জানিয়েছে, কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদীর ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মাত্রা ৪.৪ এবং গভীরতা ১০ কিলোমিটার। হঠাৎ এই কম্পনে রাজধানীর বিভিন্ন বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও শেষ খবর পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি জুনে আলোচিত চারটি ভূমিকম্পই ঘটেছে রাতের বেলায়। ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে ৫.৬ মাত্রার শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়; ১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে ৪.৫ মাত্রার আরেকটি; ১৮ জুন রাত ৯টা ২৯ মিনিটে ৪.৪ মাত্রার কম্পন; এবং সর্বশেষ ২২ জুন রাত ৯টা ২৮ মিনিটে আবারও কেঁপে ওঠে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ১১, ১৮ ও ২২ জুনের ভূমিকম্পগুলো প্রায় একই সময়ে—রাত ৯টা ৩০ মিনিটের কাছাকাছি—অনুভূত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের সঙ্গে দিন বা রাতের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই; তবে রাতের নীরব পরিবেশ, অধিকাংশ মানুষের ঘরে অবস্থান এবং উঁচু ভবনে কম্পনের বেশি অনুভূতির কারণে রাতের ভূমিকম্প মানুষের মনে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত এবং সাম্প্রতিক ছোট কম্পনগুলো ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক চাপের স্বাভাবিক মুক্তির অংশ হতে পারে। তিনি এগুলোকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস না বললেও সতর্কতা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন।
পরপর কয়েক সপ্তাহে চারবারের মতো ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—দেশ কি বড় কোনো ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে? যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন আশঙ্কার পক্ষে এখনই নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই, তবে ছোট ছোট কম্পনগুলো ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বড় শহরের বহুতল ভবননির্ভর জীবনযাত্রা নগরবাসীকে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, তাই ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, জরুরি প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টি আবারও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। জুনের ধারাবাহিক এই কম্পন অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখনো বাস্তব, এবং সেই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় মুখোমুখি হচ্ছে দেশের নগরবাসী।



