মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার অনেক আগেই ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে—কোনো গোল বা ড্রিবলিংয়ের জন্য নয়, বরং অর্থের ঝনঝনানির জন্য। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একে ‘মানবজাতির দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ ইভেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এটি ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক প্রতিযোগিতা হবে। ফিফার সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চার বছরের চক্রে সংস্থাটির মোট আয় হবে রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আসবে শুধু চলতি বছরেই।
এই আয় বিশ্বের আরেক বড় ক্রীড়া আসর অলিম্পিককেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক যেখানে আয় করেছিল ৫.২৪ বিলিয়ন ডলার, ফিফার আয় তার দ্বিগুণের বেশি। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার বিশাল বাজার (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) লক্ষ্য করে আয়োজন করায় ভাগ্য খুলেছে ফিফার। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে অলিম্পিকের চেয়ে পিছিয়ে ছিল ফিফা; এখন পুরোপুরি উল্টো চিত্র।
আয়ের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো— সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট ও স্পনসরশিপ। এবার ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮টি দল খেলবে, ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে ১০৪-এ যাবে, ফলে টিভি স্বত্ব বিক্রিতে সব রেকর্ড ভাঙছে। টিকিটের দাম বাড়ানো হয়েছে অস্বাভাবিক হারে। ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ফাইনাল ম্যাচের সর্বোচ্চ টিকিটের মূল্য ১০,৯৯০ ডলার, যা কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের চেয়ে সাত গুণ বেশি। স্পনসরশিপ থেকে কোকা-কোলা, আরামকো ও অ্যাডিডাসের মতো ব্র্যান্ডগুলো ফিফাকে দিচ্ছে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার।
অঢেল আয়ের বিপরীতে ফিফা প্রাইজমানিও বাড়িয়েছে। কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে এবার মোট প্রাইজমানি ধরা হয়েছে ৮৭১ মিলিয়ন ডলার। প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশ অন্তত ১২.৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা) নিশ্চিতভাবে পাবে। এ ছাড়া ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে পর্দার আড়ালে অসন্তোষও রয়েছে। টিকিট, স্পনসরশিপ ও পার্কিংয়ের সব লাভ নিচ্ছে ফিফা, কিন্তু নিরাপত্তা, পরিবহন ও পর্যটনের বিশাল খরচ বহন করতে হচ্ছে আয়োজক শহরগুলোকে। নিউইয়র্কের মতো শহর বাড়তি খরচের চাপে ‘ফ্যান ফেস্টিভ্যাল’ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া ফিফা করমুক্ত সুবিধা পেলেও খেলোয়াড় ও জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর ওপর মার্কিন ফেডারেল ট্যাক্সের বোঝা চাপার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য, যার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।



