পাবনা প্রতিনিধি
পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রাজস্ব শাখায় অফিস সহায়ক (পিয়ন) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয় এসএসসি পাশ। কিন্তু চাকুরি প্রার্থীদের প্রায় সবাই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। চাকরি হয়েছে ১৮ জনের। এর মধ্যে ১৭ জনই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএসহ মাস্টার্স ও অনার্স ডিগ্রিধারী।
নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গত ২৫ জুন এই নিয়োগপ্রাপ্তদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র প্রদান করেন জেলা প্রশাসক। বিনা পয়সায় চাকুরি পেয়ে খুশি নিয়োগপ্রাপ্তরা। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। অনেকে বিষয়টিতে শিক্ষা ব্যবস্থার দৈন্যদশার চিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কোনো তদবির বা অর্থ লেনদেন ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এদের চাকরি হওয়ায় প্রশংসায় ভাসছেন পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৫ অক্টোবর অফিস সহায়কের ১৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জাতীয় বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক (পূর্বে পদটির নাম ছিল এমএলএসএস এবং যোগ্যতা ছিল ৮ম শ্রেণি পাশ )। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রায় ৮ হাজার চাকুরি প্রার্থী পদটিতে আবেদন করেন।
গত ১৯ জুন চাকুরি প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ৪ হাজার চাকুরি প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে ৪৪ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরদিন ২০ জুন মৌখিক পরীক্ষায় ১৮ জনকে চুড়ান্ত করা হয়। কোনো ধরনের তদবির , চাপ ও অর্থ লেনদেন ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে ১৮ প্রার্থীকে চুড়ান্ত করা হয় বলে জেলা প্রশাসন সুত্র দাবি করেছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সুত্রে আরও জানা যায়, সদ্য নিয়োগ পাওয়া এই ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে পাবনার চাটমোহর উপজেলা থেকে নিয়োগ পাওয়া সুজন মিয়া পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। পাবনা সদর উপজেলার দিলালপুর মহল্লার ওয়ালিয়েল রাদ আমেরিকান ইন্টান্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ত্রিপল-ই বিষয়ে বিএসসি ইঞ্জিয়ার পাশ।
জেলা সদরের রাকিবুল ইসলাম পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাশ, ঈশ্বরদী উপজেলার উজ্জ্বল হোসেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাশ, সদর উপজেলার শাখারীপাড়া মহল্লার আলতাব হোসেন পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন।
বেড়া উপজেলার ইয়া খাতুন ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স পাশ, একই উপজেলার রাকিব হোসেন ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে মাস্টার্স সহ নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮ জনের ১৭ জনই এরকম বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারী।
গত ২৫ জুন এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এই ১৮ জনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম। এ সময় তাঁদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। এরপর সেই অনুষ্ঠানের ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে নানারকম আলোচনা-সমালোচনা।
ফেসবুকের একটি পোস্টের কমেন্টে সিরাজ মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, এদের নিয়োগ দেওয়া ঠিক হয়নি। আবেদনের যোগ্যতা যেহেতু এসএসসি, সেক্ষেত্রে অধিক শিক্ষিতদের আবেদন বাতিল করা প্রয়োজন ছিলো।
আলী মোরতোজা নামে এক ব্যক্তির মন্তব্য, এসএসসি পাশ করে যারা আর পড়তে পারেন না এই চাকুরিটা তাঁদের জন্য ছিল। তাই এই নিয়োগ স্বচ্ছ বলা যায় না। এই নিয়োগে অন্যের হক নষ্ট করা হয়েছে। অবিলম্বে এই নিয়োগ বাতিল করা হোক।
সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি এই নিয়োগে জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে এস এম নুরুন্নবীর মন্তব্য, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি উদ্যোক্তা তৈরি করে না।
চাকুরি পাওয়া পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিংয়ে মাস্টার্স পাশ করা আলতাব হোসেন বলেন, ২০১৪ সালে বাবা মারা যায়, টিউশনি করে খুব কষ্ট করে পড়াশুনা করি। পারিবারিক নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবে এই পদে চাকরী করতে এসেছি। বর্তমানে আমার ৬ সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব আমার হাতে। মা, বিধবা এক বোন, আমার স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। অভাব কি জিনিস আমি জানি। এই চাকুরি ছাড়া আমার কোন উপায় ছিল না।
এ বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীমের। তিনি বলেন, বলেন, এতে দুইটি দিক মনে হয়েছে। একটি হচ্ছে দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকার বাড়ছে। অন্যটি হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার দৈন্যদশা। সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষার কারণে শিক্ষার্থীদের মনোবল তৈরি হচ্ছে না।
পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান বলেন, বর্তমানে কর্মসংস্থানে অভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা কম যোগ্যতার চাকরী বেছে নিচ্ছে। দেশে দক্ষ শিক্ষিত ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কম থাকায় সাধারণ বিষয় নিয়ে পাশ করা শিক্ষার্থীরা ভালো চাকরীর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আমার কর্মজীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। পাবনার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ এবং প্রশাসনের কেউই আমাকে কোনো ধরনের সুপারিশ বা চাপ দেননি। এজন্য আমি তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। একইসঙ্গে তিনি বলেন, আমি দুর্নীতি করবো না এবং কাউকে দুর্নীতি করতে দেবো।
তবে ছোট পদের চাকুরিতে উচ্চ শিক্ষিতরা কেন আসছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়েও সরকারি চাকরির ছোট পদে আসা যোগ্যতার অপচয় মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে অনেক বাস্তব কারণ থাকে। চাকরির নিরাপত্তা, সম্মান ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সরকারি চাকরি শব্দটার আলাদা মর্যাদা, নিয়মিত বেতন, পেনশন/সুবিধা ও স্থায়ী জীবন, ভবিষ্যত নিশ্চয়তা, বেকারত্ব ও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা এবং সর্বপরি পরিবারের চাপ। এসব মিলিয়ে একজন উচ্চ শিক্ষিত তরুণ যুবক ছোট পদের চাকুরিতে প্রবেশ করছে।



