আজ ৫ নভেম্বর, বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস। সুনামির ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫ নভেম্বরকে বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সুনামির ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের মধ্যে অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ বিনিময়কে উৎসাহিত করা।
‘সুনামি’ শব্দটি জাপানি ভাষার ‘ৎসু’ (বন্দর) এবং ‘নামি’ (ঢেউ) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সাধারণত সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট বিশাল ঢেউয়ের ধারাকে সুনামি বলা হয়। তবে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সমুদ্রতলের ভূমিধস, উপকূলীয় শিলাধস এবং সমুদ্রে বড় কোনো গ্রহাণুর আঘাত থেকেও সুনামির সৃষ্টি হতে পারে।
সুনামির ঢেউ সাধারণ সামুদ্রিক ঢেউয়ের মতো নয়। সমুদ্রের গভীরে এর গতিবেগ অত্যন্ত বেশি হতে পারে। উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছালে ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে যায় এবং বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করতে পারে। এর ফলে প্রাণহানি, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০০ বছরে ৫৮টি সুনামিতে ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিটি দুর্যোগে গড়ে প্রাণহানি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ জনের। এ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামি।
ওই সুনামিতে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ একাধিক দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। এ বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে সুনামি সতর্কতা ও দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে জাপানের কোবেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত হয় হিয়োগো অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক।
পরবর্তী সময়ে ভারত মহাসাগর সুনামি সতর্কতা ও প্রশমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। সমুদ্রতলের ভূমিকম্প এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন স্থানে পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় সুনামি তথ্যকেন্দ্রগুলোতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
সুনামির ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপান দীর্ঘদিন ধরে আগাম সতর্কতা, জনসাধারণের প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দেশটিতে নিয়মিত দুর্যোগ মহড়া, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।
অন্যদিকে, সুনামিপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ ও পর্যটন বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে ২০১৫ সালের মার্চে গৃহীত হয় ‘সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ২০১৫-২০৩০’। ১৫ বছর মেয়াদি এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হলো দুর্যোগে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।
বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবসে তাই সুনামির ঝুঁকি সম্পর্কে জানা, আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।



