বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে, রাস্তার পাশে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে সহজেই দেখা মেলে বিন্না ঘাসের। দেখতে সাধারণ এই ঘাসের শিকড়ের রয়েছে অসাধারণ ক্ষমতা। মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়া শক্তিশালী শিকড় ভূমিকে আঁকড়ে ধরে রাখে, যা ভূমিক্ষয়, পাহাড়ধস ও নদীতীরের ভাঙন কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিন্না ঘাসের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোন কোন ক্ষেত্রে এই ঘাস কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা যাচাই করতে একটি কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম প্রায় দুই দশক ধরে বিন্না ঘাস নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, এই ঘাসের শিকড় দ্রুত মাটির গভীরে প্রবেশ করে এবং মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে। ফলে রাস্তার পাশের ঢাল, পাহাড়ি এলাকা, বাঁধ ও নদীতীরের মাটির ক্ষয়রোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব ধরনের ভূমিক্ষয় বা নদীভাঙন প্রতিরোধে এই ঘাস সমানভাবে কার্যকর নয়; স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী এর ব্যবহার নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিন্না ঘাস কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বিন্না ঘাসের ইংরেজি নাম ভেটিভার (Vetiver)। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি বেন্না ঘাস বা খসখস নামেও পরিচিত। এটি একটি বহুবর্ষজীবী ঘাস, যা ঘন ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে। এর লম্বা ও সরু পাতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়া শক্তিশালী শিকড়। গবেষকদের মতে, উপযুক্ত পরিবেশে এর শিকড় কয়েক মিটার গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। শিকড়গুলো মাটির ভেতরে প্রাকৃতিক জালের মতো বিস্তৃত হয়ে মাটির বিভিন্ন স্তরকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান পরীক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহিমের মতে, বিন্না ঘাসের শিকড় শুধু মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে না, বরং ভূমির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও সহায়তা করে। এ কারণে ভূমিক্ষয় মোকাবিলায় ঘাসটিকে সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এর শিকড় থেকে সুগন্ধি তেল সংগ্রহ করা হয়, যা সুগন্ধি, প্রসাধনী ও বিভিন্ন সুগন্ধি পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ভূমিক্ষয় রোধে প্রাকৃতিক সমাধান
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভূমিক্ষয়, পাহাড়ধস, নদীতীরের ভাঙন এবং সড়কের পাশের ঢাল সুরক্ষায় ভেটিভার ঘাস ব্যবহার করা হয়। থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রাজিল ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে মাটি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি রক্ষায় এর ব্যবহার রয়েছে। উপযুক্ত পরিবেশে রোপণের কয়েক মাসের মধ্যেই এর শিকড় বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। ঘাসের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখায় বৃষ্টির পানি ও পানির স্রোতে মাটির ওপরের স্তর ধুয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
বাংলাদেশেও সড়ক ও জনপথের পাশের ঢাল, খালের পাড়, বাঁধ এবং পাহাড়ি এলাকার মাটি রক্ষায় এই ঘাস ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে মাটি রক্ষায় কংক্রিট, সিমেন্ট, রড ও জিও ব্যাগের মতো উপকরণ ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিন্না ঘাস এসব উপকরণের বিকল্প বা সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। গবেষকদের মতে, সঠিক জায়গায় পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি তুলনামূলক কম ব্যয়ে এবং পরিবেশের ওপর কম প্রভাব ফেলে মাটি সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিন্না ঘাস সব ধরনের প্রকৌশলগত সমস্যার সমাধান নয়। খরস্রোতা নদীর তীব্র ভাঙন কিংবা প্রবল স্রোতের মুখে থাকা বাঁধ রক্ষায় শুধু এই ঘাসের ওপর নির্ভর করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ, কংক্রিট ব্লক বা অন্যান্য প্রকৌশলগত ব্যবস্থাও নিতে হবে। অর্থাৎ, বিন্না ঘাসকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে মাটির ধরন, পানির প্রবাহ, ঢালের প্রকৃতি ও স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
বাংলাদেশে বিন্না ঘাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা কেন?
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে নদীভাঙনও দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাশাপাশি খাল খনন ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে খালের পাড় ও আশপাশের মাটি স্থিতিশীল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কম খরচে ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি খুঁজতে গিয়ে বিন্না ঘাসের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারের উদ্যোগে খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি খালের পাড়, সড়কের ঢাল এবং পাহাড়ি এলাকার মাটি রক্ষায় এই ঘাস ব্যবহার করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে গঠিত কারিগরি কমিটি সম্ভাব্য ব্যবহারক্ষেত্র ও বাস্তবায়নের উপযোগিতা যাচাই করবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও নদীভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয়রোধে বিন্না ঘাসকে কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে কোন প্রকল্পে কতটা ঘাস ব্যবহার করা হবে, কোথায় এটি কার্যকর হবে এবং প্রচলিত প্রকৌশলগত ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে, বিন্না ঘাস বাংলাদেশের ভূমিক্ষয় ও অবকাঠামো সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। এর সহজলভ্যতা, শক্তিশালী শিকড় এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য একে সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক উপাদানে পরিণত করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উপযুক্ত স্থানে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং প্রকৌশলগত মূল্যায়ন। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বিন্না ঘাস দেশের মাটি সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



