একসময় গ্রামের সবাই তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে ‘মণ্ডল-বউ’ বলে ডাকত। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের নিষ্ঠুর ভাঙন কেবল তাঁর ভিটেমাটি আর ফসলি জমিই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাঁর সেই গর্বের সামাজিক পরিচয়ও!
আটষট্টি বছর বয়সী সখিনা বেগম এবং তাঁর তিহাত্তর বছর বয়সী স্বামী খতিব উদ্দিন মণ্ডলের একসময় কুড়িগ্রামে একটি অত্যন্ত সচ্ছল ও সুখী পরিবার ছিল। তাঁদের ষোলো বিঘার উর্বর জমি, বড় ফলের বাগান আর গোয়ালভরা গরু ছিল। গ্রামের যেকোনো দরকারে মানুষ সখিনার কাছে ছুটে আসত এবং তিনি হাসিমুখে সবাইকে চাল-ডাল বা টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন। কিন্তু গত চার-পাঁচ বছরের ভাঙনে নদী তাঁদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন তাঁরা সরকারি বাঁধের ওপর একটি ছোট্ট ঘরে বাস করেন। যে নারী একসময় অন্যদের সাহায্য করতেন, তাঁকে আজ বেঁচে থাকার তাগিদে স্বামীর সঙ্গে অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীভাঙনের কথা উঠলেই সাধারণত আমরা কেবল পুরুষদের জমি হারানোর কথা ভাবি। কিন্তু সখিনার মতো নারীদের সামাজিক অবস্থান হারানোর এই নীরব কষ্টগুলো সব সময় আড়ালেই থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার হওয়া নারীরা তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিচিত সামাজিক বন্ধন ও সম্মান চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।
আজ এত কষ্টের মাঝেও মাঠে কাজ করার সময় যদি পুরোনো কোনো পরিচিত মানুষ সখিনাকে হঠাৎ ‘মণ্ডল-বউ’ বলে ডেকে ওঠেন, তখন তাঁর ক্লান্ত মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। প্রতিবছর নদীভাঙনে হাজার হাজার হেক্টর জমি হারানোর অনেক হিসাব সরকারি খাতায় থাকলেও, একজন নারীর এই অমূল্য সামাজিক পরিচয় হারানোর হিসাব যেন সত্যিই কারও কাছে নেই!



