মানুষের ইতিহাস যত পুরোনো, অলৌকিক বা প্যারানরমাল বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহও ততটাই প্রাচীন। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ভূত, আত্মা, অশরীরী সত্তা, জিন, অলৌকিক শক্তি কিংবা রহস্যময় অভিজ্ঞতার নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। কেউ দাবি করেন, তারা মৃত মানুষের আত্মা দেখেছেন; কেউ অনুভব করেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের স্পর্শ করেছে; আবার কেউ বিশ্বাস করেন যে মানুষের মনের এমন কিছু ক্ষমতা রয়েছে যা সাধারণ বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার বাইরে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতার পেছনে সত্যিই কি অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি কাজ করে, নাকি মানুষের মন ও মস্তিষ্কই এমন অনুভূতির জন্ম দেয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যুক্তরাজ্যের The University of Edinburgh-এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত গবেষণাকেন্দ্র Koestler Parapsychology Unit।
১৯৮৫ সালে প্রখ্যাত লেখক ও দার্শনিক Arthur Koestler-এর রেখে যাওয়া অর্থানুকূল্যে এই গবেষণা ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে “পারাসাইকোলজি” শব্দটি শুনে অনেকেই মনে করেন, এখানে হয়তো ভূত-প্রেতের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই গবেষণা ইউনিটের গবেষকরা ভূত বা অশরীরী সত্তা বাস্তবে আছে কি না, তা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে কাজ করেন না। বরং তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের সেইসব অভিজ্ঞতার বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করা, যেগুলোকে মানুষ সাধারণত অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত বলে মনে করে।
গবেষকদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় তার চারপাশের পরিবেশকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু কখনো কখনো পরিবেশের অস্পষ্ট তথ্য, অন্ধকার, নিস্তব্ধতা, ভয় কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্ক ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে। তখন একজন ব্যক্তি এমন কিছু দেখতে, শুনতে বা অনুভব করতে পারেন যা বাস্তবে উপস্থিত নয়। এই ঘটনাকে মনোবিজ্ঞানে উপলব্ধিগত বিভ্রম (Perceptual Illusion) বা হ্যালুসিনেশনের বিভিন্ন রূপের সঙ্গে তুলনা করা হয়। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই “ভূত দেখা” বলতে যা বোঝানো হয়, তা মানুষের উপলব্ধি ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালীর একটি ফল হতে পারে।
এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Sleep Paralysis বা ঘুমজনিত পক্ষাঘাত। অনেক মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠে অনুভব করেন যে তারা নড়াচড়া করতে পারছেন না, বুকের ওপর ভারী কিছু চাপা পড়েছে, কিংবা ঘরে কোনো অদৃশ্য সত্তা দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই অভিজ্ঞতাকে ভূত, জিন বা অশরীরী শক্তির আক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও স্নায়ুবিজ্ঞান দেখায় যে এটি মূলত ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় অবস্থা। অর্থাৎ অতিপ্রাকৃত বলে মনে হলেও এর একটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
Koestler Parapsychology Unit-এর গবেষকরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি তার অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের কোনো গ্রামে যদি ছোটবেলা থেকেই মানুষ শুনে বড় হয় যে নির্দিষ্ট একটি বটগাছে ভূত থাকে, তাহলে রাতের অন্ধকারে সেই গাছের কাছে গিয়ে সামান্য শব্দ বা ছায়াকেও অনেকের কাছে ভূতের উপস্থিতি বলে মনে হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপে একই ধরনের অভিজ্ঞতাকে “Ghost” বা “Poltergeist” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ অভিজ্ঞতার ধরন অনেক ক্ষেত্রে এক হলেও তার ব্যাখ্যা সংস্কৃতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
গবেষণায় ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় কল্পনাপ্রবণ, আবেগপ্রবণ কিংবা রহস্যময় অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হন। ফলে তারা দৈনন্দিন জীবনের কিছু অস্বাভাবিক ঘটনাকেও অতিপ্রাকৃত হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখান। আবার যারা আগে থেকেই ভূত-প্রেত বা অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস করেন, তাদের ক্ষেত্রে সেই বিশ্বাস নতুন অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যাকেও প্রভাবিত করে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে Expectation Effect বা প্রত্যাশাজনিত প্রভাব বলা হয়।
এই গবেষণা ইউনিটে কেবল ভূত-প্রেত নিয়ে নয়, টেলিপ্যাথি, ভবিষ্যৎ অনুভব (Precognition), সাইকোকাইনেসিস, মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা (Near-Death Experience), আউট-অফ-বডি এক্সপেরিয়েন্সসহ নানা ব্যতিক্রমী মানব-অভিজ্ঞতা নিয়েও গবেষণা করা হয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষকরা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগার, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ, মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা, প্রশ্নাবলি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণ করেন। অর্থাৎ কোনো দাবি গ্রহণ করার আগে সেটিকে কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচাই করা হয়।
তবে পারাসাইকোলজি গবেষণা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজে মতভেদও রয়েছে। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, এ পর্যন্ত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার পক্ষে এমন কোনো শক্তিশালী ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা মূলধারার বিজ্ঞানকে পরিবর্তন করতে পারে। অন্যদিকে পারাসাইকোলজি গবেষকদের বক্তব্য হলো, মানুষের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতাগুলো বাস্তবেই ঘটে—যদিও তার কারণ অতিপ্রাকৃত নাও হতে পারে। তাই এসব অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা না করে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করাই উচিত।
সবশেষে বলা যায়, এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের Koestler Parapsychology Unit মানুষের বিশ্বাস, উপলব্ধি এবং রহস্যময় অভিজ্ঞতার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। তারা ভূত-প্রেতের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে না; বরং মানুষের মন কীভাবে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে, কেন মানুষ অলৌকিক অভিজ্ঞতার দাবি করে এবং কেন অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস মানবসমাজে এত গভীরভাবে প্রোথিত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। ফলে এই গবেষণা আমাদের শেখায় যে অনেক সময় রহস্যের প্রকৃত উত্তর অতিপ্রাকৃত জগতে নয়, বরং মানুষের মন ও মস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রণালীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।



