রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করা অসংখ্য নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আমরা প্রায়ই ভাবি, এই বিশাল মহাবিশ্বের শুরু কোথায়? প্রথম নক্ষত্রগুলো কেমন ছিল? প্রথম ছায়াপথ কীভাবে জন্ম নিয়েছিল? হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু কল্পনা নয়, বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই মহাবিশ্বের অতীতকে দেখা সম্ভব হচ্ছে। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীন—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। আর এই ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত আছেন একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী, ড. লামীয়া মওলা। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মতো তিনিও শুধু মহাবিশ্বকে দেখেননি; তিনি সেই গবেষণা দলের অংশ হয়েছেন, যারা মহাবিশ্বের জন্ম-ইতিহাস পড়ে শোনাচ্ছেন মানবজাতিকে।
ড. লামীয়া মওলার গল্প শুধু একজন সফল বিজ্ঞানীর গল্প নয়, এটি অধ্যবসায়, মেধা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের উপস্থিতির এক অনন্য উদাহরণ। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ২০২০ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ইয়েলের মতো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল দূরবর্তী ছায়াপথ বা হাই-রেডশিফট গ্যালাক্সি—যেসব গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। পিএইচডি শেষ করার পর তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ডানল্যাপ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকেই তিনি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপকে শুধু একটি দূরবীন বললে ভুল হবে। এটি মানবজাতির সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক প্রকল্পগুলোর একটি। প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই টেলিস্কোপ তৈরিতে দুই দশকেরও বেশি সময় লেগেছে। ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর এটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে ল্যাগরাঞ্জ-২ বিন্দুতে স্থাপন করা হয়। সেখানে পৌঁছে এটি ধাপে ধাপে তার বিশাল সানশিল্ড এবং ১৮টি সোনালি ষড়ভুজাকার আয়না খুলে সম্পূর্ণ কার্যক্ষম হয়। এই জটিল প্রক্রিয়াকে অনেক বিজ্ঞানী “মহাকাশে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রকৌশল অভিযানগুলোর একটি” বলে বর্ণনা করেছেন।
ড. লামীয়া মওলার গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল এমন সব দূরবর্তী ছায়াপথ বিশ্লেষণ করা, যেগুলো মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়ে জন্ম নিয়েছিল। এই ছায়াপথগুলোর আলো এত দীর্ঘ সময় ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করেছে যে আজ আমরা সেগুলো দেখছি মানে আসলে আমরা মহাবিশ্বের অতীত দেখছি। বিজ্ঞানীরা যখন বলেন, “জেমস ওয়েব অতীতে তাকায়”, তখন সেটি কোনো কাব্যিক উপমা নয়; এটি পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তবতা। আলোর গতির সীমাবদ্ধতার কারণে যত দূরের কোনো বস্তুকে দেখা যায়, তত পুরোনো সময়কে দেখা যায়। ফলে ড. লামীয়া মওলা এবং তাঁর সহকর্মীরা শুধু ছবি বিশ্লেষণ করেন না, তাঁরা আসলে মহাবিশ্বের প্রথম যুগের ইতিহাস পড়েন।
একটি দূরবর্তী ছায়াপথের ছবি আমাদের চোখে হয়তো একটি ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু মাত্র। কিন্তু সেই আলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য তথ্য। এর রঙ, উজ্জ্বলতা, বর্ণালী এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন সেই গ্যালাক্সির বয়স, সেখানে কত দ্রুত নতুন নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে, কোন কোন মৌল বিদ্যমান এবং সেই গ্যালাক্সি কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে। এই জটিল বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন উন্নত কম্পিউটার মডেল, পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। ড. লামীয়া মওলা সেই গবেষণারই একজন সক্রিয় অংশীদার, যেখানে প্রতিটি নতুন পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ করে দেয়।
আজ যখন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ একের পর এক বিস্ময়কর ছবি পাঠাচ্ছে, তখন সেই ছবির পেছনে হাজারো বিজ্ঞানীর পরিশ্রম লুকিয়ে আছে। সেই বিজ্ঞানীদের সারিতেই একজন বাংলাদেশি হিসেবে ড. লামীয়া মওলার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গর্বের। তাঁর এই অর্জন প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চায় অবদান রাখার জন্য ভৌগোলিক সীমা কোনো বাধা নয়।



