বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সম্মানজনক ও জমজমাট আয়োজনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের সুরম্য সমুদ্রতীরবর্তী শহর কানে আয়োজিত বার্ষিক কান চলচ্চিত্র উৎসব (Cannes Film Festival)। ইতিমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৯তম আসর আগামী ১২ মে থেকে ২৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্ত থেকে আগত খ্যাতনামা ও উদীয়মান চলচ্চিত্র নির্মাতা, কিংবদন্তি অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক, সমালোচক, বিতার্কিক এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা এই উৎসবকে ঘিরে জমায়েত হবেন, যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক বিশাল মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হবে। কান উৎসব শুধু চাকচিক্য ও তারকাখচিত আয়োজনের জন্যই বিখ্যাত নয়; বরং নতুন চলচ্চিত্রের বিশ্ব প্রিমিয়ার, চলচ্চিত্রের বৈশ্বিক বাজারজাতকরণ, আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা এবং সৃজনশীল সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও এর ভূমিকা অপরিসীম। এখানে প্রদর্শিত অনেক স্বল্প বাজেটের বা স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে এবং নবীন নির্মাতাদের জন্য বিশ্বব্যাপী সুযোগের দ্বার উন্মোচিত করে।
এবারের উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হবে ফরাসি পরিচালক পিয়ের সালভাদোরির (Pierre Salvadori) নির্মিত বিশেষ আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র “লা ভেন্যুস ইলেকট্রিক” (La Vénus électrique)। ১৯২০-এর দশকের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ারের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। উদ্বোধনী জমকালো অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে কানের বিখ্যাত প্রাসাদ দে ফেস্তিভাল এ দে কংগ্রে (Palais des Festivals et des Congrès)-এ, যেখানে বিশ্ব চলচ্চিত্রের তারকারা লাল গালিচা পায়ে হেঁটে উপস্থিত হবেন। এই লাল গালিচা অনুষ্ঠানটিই গোটা বিশ্বের ফ্যাশন ও বিনোদন জগতের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে, যেখানে শুধু চলচ্চিত্র নয়, পোশাক, গহনা এবং সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতাও চলে সমান তালে।
২০২৬ সালের এই বিশেষ আসরে বিশ্ব চলচ্চিত্রে অসামান্য ও অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক পাম দর (Honorary Palme d’Or) প্রদান করা হবে দুজন কিংবদন্তি শিল্পীকে—নিউজিল্যান্ডের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা পিটার জ্যাকসন (Peter Jackson), যিনি ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজির জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন, এবং মার্কিন গায়িকা, অভিনেত্রী ও পরিচালক বারবারা স্ট্রাইস্যান্ড (Barbra Streisand), যিনি সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র উভয় ক্ষেত্রেই কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করেছেন। এছাড়া এবারের প্রধান প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা পার্ক চান-উক (Park Chan-wook), যার ‘ওল্ডবয়’, ‘দ্য হ্যান্ডমেইডেন’-এর মতো অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম আন্তর্জাতিক সমালোচকদের মন জয় করেছে। তাঁর নেতৃত্বে জুরি বোর্ড এবারের পাল্ম দর (Palme d’Or) বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্বাচন করবেন।
কান চলচ্চিত্র উৎসবকে বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে ইউরোপ, এশিয়া এবং স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এই উৎসব এক অনন্য মঞ্চের কাজ করে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ২০২৬ সালের আসরে বিভিন্ন দেশের নতুন ও সৃজনশীল চলচ্চিত্রগুলো ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসবে, যেখানে থাকবে প্রামাণ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং পরীক্ষামূলক ধারার কাজও। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পের নতুন প্রবণতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ভার্চুয়াল প্রযোজনা, ডিজিটাল ক্যামেরার উন্নত প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়েও এই উৎসবের মঞ্চে গভীর আলোচনা ও মতবিনিময় হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উৎসবের সমান্তরালে আয়োজিত ‘মার্শে দ্যু ফিল্ম’ (Marché du Film) বা চলচ্চিত্র বাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র বাণিজ্যমেলা হিসেবে কাজ করে, যেখানে হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতা একত্রিত হন নতুন চলচ্চিত্রের স্বত্ব ক্রয়-বিক্রয় এবং আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা চুক্তি করতে। এসব কারণেই কান চলচ্চিত্র উৎসব কেবল একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয়, বরং গোটা বিশ্বের চলচ্চিত্র সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিবছর নতুন মাত্রা পায়।



