যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় অনুষ্ঠিত ২১তম নর্থ আমেরিকা নজরুল সম্মেলনে নজরুলসংগীত পরিবেশন করেছেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ড. সামিয়া মাহবুব আহমদ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা ইনকরপোরেটেডের (BAAI) আয়োজনে ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর অ্যানান্ডেলের Richard J. Ernst Community Cultural Center-এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল কাজী নজরুল ইসলামের গান থেকে নেওয়া—‘আমারে দেবে না ভুলিতে’। নজরুল সম্মেলনে সামিয়ার অংশগ্রহণ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৮ সালের ১১তম এবং ২০১৮ সালের ১৭তম নর্থ আমেরিকা নজরুল সম্মেলনেও তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন।
ঢাকায় জন্ম নেওয়া ড. সামিয়া মাহবুব আহমদ হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের কিরানা ঘরানার শিল্পী। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের পথিকৃৎ গুরু শ্রী তপন বৈদ্যের কাছে তাঁর সংগীতশিক্ষার সূচনা। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী পদ্মশ্রী বিদূষী সুমিত্রা গুহর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। গুরু-শিষ্য পরম্পরার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে দীর্ঘদিনের সাধনা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি সংগীতের সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করেন।
সামিয়ার সংগীতজীবনে গুরু সুমিত্রা গুহর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০০ সাল থেকে তিনি নয়াদিল্লির Sumadhur Hansadhwani Music Institute-এর সঙ্গে যুক্ত এবং গুরুর সঙ্গে বিভিন্ন সংগীতানুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন। ২০১৯ সালে গান্ধী মেমোরিয়াল সেন্টারে সুমিত্রা গুহ ও সামিয়ার যৌথ হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশনও শ্রোতাদের নজর কেড়েছিল।
ছাত্রজীবন থেকেই সংগীতে তাঁর দক্ষতার স্বীকৃতি মিলেছে। ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে University of Maryland, Baltimore County-তে আয়োজিত Annual Indian Music and Dance Competition-এ হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। ২০০১ সালে দিল্লির লালকেল্লা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতাতেও তিনি প্রথম হন। পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি।
সংগীতের পাশাপাশি সামিয়া মাহবুব আহমদের একাডেমিক জীবনও সমৃদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাষ্ট্রের University of Maryland, College Park থেকে ১৯৯৪ সালে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স এবং ২০০৫ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবারের কাঠামো, সম্পদ বণ্টন এবং শিশুদের কল্যাণ। অর্থাৎ সংগীতচর্চার পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানের গবেষণাতেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন।
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি নজরুলসংগীত, ভজন, সমকালীন সুর এবং বিভিন্ন দেশের সংগীত নিয়েও কাজ করেছেন সামিয়া। তাঁর সংগীতচর্চায় দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পশ্চিমা সংগীতের বিভিন্ন ছন্দ ও সুরের সঙ্গে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সমন্বয়ের প্রয়াস দেখা যায়। কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘Srijana Chhande’, যা নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে নতুন প্রজন্মকে কেন্দ্র করে তাঁর আরেকটি অ্যালবাম ‘Rasneem’ প্রকাশিত হয়।
সংগীতের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে তিনি নৃত্য, কবিতা ও ভিজ্যুয়াল আর্টের সঙ্গেও সংগীতকে যুক্ত করে বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন। ২০২৩ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘Veer Meera’ নামের সংগীত-নৃত্যনির্ভর প্রযোজনায় তিনি তাঁর গুরু সুমিত্রা গুহর সঙ্গে কাজ করেন। মীরা বাইয়ের জীবন, আধ্যাত্মিকতা ও নারীর আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রযোজনায় সংগীত, কবিতা ও নৃত্যের সমন্বয় ঘটানো হয়।
সামিয়া মাহবুব আহমদের সংগীতজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষাদান। ঐতিহ্যবাহী গুরু-শিষ্য পদ্ধতির পাশাপাশি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি ও বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের কর্মশালা এবং লেকচার-ডেমনস্ট্রেশনের মাধ্যমে তিনি সংগীতের জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘ সংগীতচর্চা, গবেষণা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত এবং নজরুলসংগীতের ঐতিহ্য প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নজরুলসংগীতের সাধনা, হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা এবং একাডেমিক গবেষণাকে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া ড. সামিয়া মাহবুব আহমদের পথচলা প্রবাসে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। নর্থ আমেরিকা নজরুল সম্মেলনে তাঁর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ সেই সাংস্কৃতিক সংযোগকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।



